জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাবে দেশের বাজারে আবারও লাগামহীন হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতি। গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিলে তা ফের ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের এপ্রিলে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, এখন তা কিনতে ভোক্তাকে ব্যয় করতে হচ্ছে ১০৯ টাকা ০৪ পয়সা।
মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত এবং এর প্রেক্ষিতে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় গত ১৮ এপ্রিল সরকার দেশে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য এবং খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই পণ্যের দাম এক মাসের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চাপের ফলে এই পথটি যদি সংকটের মুখে পড়ে, তবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, যা আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়ে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি উল্লম্ফন দেখা গেছে খাদ্যবহির্ভূত খাতে; যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে। জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন পোশাক, শিক্ষা উপকরণ এবং গৃহস্থালি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াই এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির চাপ এখন শহরের তুলনায় গ্রাম এলাকায় বেশি অনুভূত হচ্ছে। এপ্রিলে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলেও এই হার ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ০২ শতাংশ হয়েছে। যদিও শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ গ্রামের চেয়ে কিছুটা বেশি, তবে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় গ্রামের সাধারণ মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির এই পারদ যখন দ্রুতগতিতে ওপরের দিকে উঠছে, তখন সাধারণ মানুষের আয় বা মজুরি বৃদ্ধির হার সে তুলনায় একেবারেই নগণ্য। বিবিএসের তথ্যমতে, এপ্রিলে মজুরি বৃদ্ধির হার কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ালেও তা ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক পেছনে রয়েছে। এর অর্থ হলো, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ আয়ের চেয়ে ব্যয়ের চাপে বেশি দিশেহারা হয়ে পড়ছে। গত এক বছরের মজুরি সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলের মজুরি বৃদ্ধির হার (৮ দশমিক ১৯ শতাংশ) থেকে বর্তমান হার আরও কমেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর আরোপিত নতুন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যকে দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীতে সংকটের ফলে যদি সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে, তবে আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্য ও শিল্প উপকরণের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডলারের সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়নের ফলে এই আঘাত আরও তীব্র হতে পারে। সরকারের মন্ত্রীরা আগেই যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যার প্রতিফলন এখন পরিসংখ্যানের তথ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য এবং বৈশ্বিক যুদ্ধের দামামা মূল্যস্ফীতিকে যে স্তরে নিয়ে গেছে, তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির সঠিক সমন্বয় না থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও চরমে পৌঁছাবে। নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠে মার্চে সামান্য কমলেও, এপ্রিলে ফের এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত চেষ্টাগুলো খুব একটা সফল হচ্ছে না। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকলে সামনের মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।













