কেনো ডুবছে অর্থনীতি; ‘স্ব-সৃষ্ট’ ক্ষত নাকি বিদেশের ধাক্কা?

DSJ Web Photo April 23 2026 EconomicCrisis2026
ছবি: পিআরআই

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাসের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে যখন পুনরুদ্ধারের আভাস মিলছিল, ঠিক তখনই ‘স্ব-সৃষ্ট’ নীতিগত ভুল এবং তিনটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ধাক্কায় ফের গভীর খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। সামষ্টিক অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর পুনরুদ্ধার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, একদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, এলডিসি উত্তরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা—এই তিন বাহ্যিক চাপ; অন্যদিকে সংস্কার থেকে সরকারের পিছুটান ও নতুন করে টাকা ছাপানোর আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত “ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি” শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে।

সেমিনারে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি জানান, মার্চ মাসেই সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা মূলত ‘হাই পাওয়ার মানি’ বা নতুন ছাপানো টাকা। মূল্যস্ফীতি যখন ৮-৯ শতাংশে আটকে আছে, তখন এভাবে টাকা ছাপানোকে আগুন নিয়ে খেলার শামিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ড. আশিকুর বলেন, “সংস্কার থেকে পিছিয়ে এসে সরকার আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এটি একটি ‘স্ব-সৃষ্ট ক্ষত’, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের পক্ষে বহন করা অসম্ভব।”

২০২৪ সালের শেষ দিকে রিজার্ভ ১৮ বিলিয়ন ডলারে নামলেও বর্তমানে তা ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া এবং ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছানো ইতিবাচক লক্ষণ। তবে এই স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ক্ষত। ২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন। এর প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাংক খাতের ৩০ শতাংশ খেলাপি ঋণ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশে নেমে আসাকে দায়ী করা হয়েছে।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে তিনটি প্রধান বহিঃস্থ চাপের মুখে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ৩১ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের তথ্যমতে, বড় ধরনের ধাক্কায় ২০২৬ অর্থবছর শেষে জ্বালানি আমদানির বিল ১৬-১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা হারানো এবং তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা। ড. সাত্তার সতর্ক করে বলেন, “বর্তমানে আমাদের জ্বালানি মজুদ মাত্র তিন মাসের, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি)-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম দ্বিধা কাজ করছে, যা বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি করেছে।

এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ এবং বিআইজিডি’র খন্দকার শাখাওয়াত আলী উভয়ই জোর দিয়ে বলেন, বেশিরভাগ অর্থনৈতিক সংকট ‘আত্মসৃষ্ট’। অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানো বন্ধ করে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা এবং কাঠামোগত সংস্কারকে কেবল আইএমএফের শর্ত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তারা।
পিআরআই-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানের বহুমুখী সংকটে ২০২৬ অর্থবছরে তা ৪.৭ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। অর্থনীতিবিদদের সাফ কথা—স্বল্পমেয়াদী জনপ্রিয় বা রাজনৈতিক স্বস্তির সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। এখন সময় সতর্ক, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং সংস্কারমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top