এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: সুযোগ হারানো না-কি এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ?

Web Photo April 13 2026 LDCGraduation
ডিএসজে

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণকে ‘বোঝা’ নয়, বরং বিশ্ববাজারে সক্ষমতা প্রমাণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা। তাঁরা মনে করেন, কেবল সময়ক্ষেপণ নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সংস্কারই এখন অর্থনীতির প্রধান রক্ষা কবচ। গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সানেম ও অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের যৌথ সেমিনারে এই অভিমত উঠে আসে।

‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর: বাণিজ্য, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও কাঠামোগত সংস্কার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আব্দুর রহিম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের ডেপুটি হাই কমিশনার ক্লিনটন পবকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান অনুষ্ঠানে তাঁর রচিত ছয়টি নীতি গবেষণাপত্রের ফলাফল উপস্থাপন করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের নিট কল্যাণ ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও আরসিইপি (RCEP) এবং চীন-এফটিএ-র মতো বাণিজ্য চুক্তিগুলো বড় রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সেমিনারে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান তাঁর গবেষণা তুলে ধরে বলেন, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে চলমান স্থগিতাদেশ বিতর্ক আমাদের প্রয়োজনীয় সংস্কার থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে। উত্তরণ পরবর্তী অতিরিক্ত সময়কে অলসভাবে না কাটিয়ে একে সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা অনুযায়ী কাজে লাগাতে হবে।

দেশের চামড়া শিল্প নিয়ে গবেষণায় এক হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি ও ২ লাখ কর্মসংস্থান সত্ত্বেও এই খাতটি নিম্নমূল্যের পণ্য রপ্তানিতে আটকে আছে। সাভার সিইটিপির ব্যর্থতা ও এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশনের অভাবে বাংলাদেশি চামড়া বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন। আলোচকরা উল্লেখ করেন যে, এই খাতের সমস্যা কারিগরি নয় বরং নেতৃত্বের অভাব এবং পরিবেশগত সম্মতির ঘাটতিই প্রধান বাধা।

বাণিজ্য ও শিল্পনীতির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতাকেও একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে গড় শুল্কহার এবং প্যারা-ট্যারিফ অত্যন্ত বেশি, যা রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাধা দিচ্ছে। ভিয়েতনামের বৈচিত্র্যময় রপ্তানি ঝুড়ির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো নিম্ন-প্রযুক্তির তৈরি পোশাকের ওপর অতি-নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ব যখন ম্যান-মেড ফাইবারের দিকে এগিয়েছে, বাংলাদেশ তখনো তুলার ওপর নির্ভর করে আছে।

ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বাংলাদেশের জিডিপি ২.৯ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হওয়ার এবং ভোক্তা মূল্য ৬.১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, তৈরি পোশাক খাত ধীরে ধীরে পূর্ণতার স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ প্লাস্টিকের মতো সম্ভাবনাময় খাত এখনো অনাবিষ্কৃত। বিশ্ব যখন কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবারে এগিয়ে গেছে, বাংলাদেশ তখনো তুলার ওপর নির্ভরশীল। তিনি নতুন কোনো অলীক সমাধানের পেছনে না ছুটে বিদ্যমান সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের ওপর জোর দেন।

অস্ট্রেলিয়ান ডেপুটি হাই কমিশনার ক্লিনটন পবকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। বৈশ্বিক সংকট নীতিগত সুযোগকে সীমিত করলেও এটি গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে অনিবার্য করে তুলেছে। তিনি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানান।

ইউএনডিপির প্রতিনিধি ওয়াইস পারে উল্লেখ করেন, পোশাক খাতের সাফল্য কেবল শুল্ক-সুবিধার ফল নয়, এটি বেসরকারি খাতের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল। তিনি শিল্পনীতির কার্যকর বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সিদ্ধান্তের গুণগত মান বৃদ্ধির দাবি জানান।

প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক এক কঠোর সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চামড়া বা নিটওয়্যার খাতের স্থবিরতার মূল কারণ প্রযুক্তিগত নয়, বরং নেতৃত্বের অভাব। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক খাতে যেভাবে সম্মিলিত পরিবর্তন এসেছিল, অন্যান্য খাতের উন্নয়নেও তেমন জোরালো ধাক্কার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

ড. সেলিম রায়হান উপসংহারে বলেন, নিষ্ক্রিয়তার মূল্য হবে চড়া। যদি বাংলাদেশ তার বাণিজ্য ও শিল্পনীতিকে একীভূত করতে না পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্রমশ ক্ষয়ে যাবে। তাই এলডিসি উত্তরণকে বাধার পরিবর্তে রূপান্তরের চাবিকাঠি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top