দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধানকে বৈষম্যমূলক মনে করে তা একই হারে নিয়ে আসার জোরালো প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সভায় এই দাবি উত্থাপন করা হয়। মূলত ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস এবং বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান বিদ্যমান। বর্তমানে শর্ত সাপেক্ষে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২০ শতাংশ থেকে ২২.৫০ শতাংশ পর্যন্ত, যেখানে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২৭.৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ডিসিসিআই তাদের প্রস্তাবে উভয় খাতের কর হার সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান কর কাঠামো অনুযায়ী, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বিএসইসি ও ডিএসইর কঠোর নজরদারিতে থাকতে হয়। তাদের প্রতি প্রান্তিকে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং বিধিবদ্ধ নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এই নিয়মতান্ত্রিকতাকে উৎসাহিত করতেই সরকার তাদের কর ছাড় দেয়। অন্যদিকে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হওয়ায় লভ্যাংশের সুফল জনগণের হাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটিও এখানে সহজতর হয়।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই করের ব্যবধান কমিয়ে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে আনা প্রয়োজন। এতে সব ধরনের কোম্পানি সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে এবং শিল্পের চাকা আরও দ্রুত ঘুরবে। পাশাপাশি তিনি করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা করা এবং অগ্রিম ভ্যাট ব্যবস্থা বিলুপ্তির প্রস্তাবও করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, আগামী বাজেটে তাঁদের ওপর নতুন করে কোনো করের খড়্গ আসবে না। অর্থমন্ত্রীর ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার রাজস্বের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে করজাল সম্প্রসারণ করবে, কিন্তু ব্যক্তিগত করের হার বাড়াবে না। তিনি আরও বলেন, এনবিআর এবং অর্থ মন্ত্রণালয় একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে, যার প্রতিফলন বাজেটে দেখা যাবে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। স্পট মার্কেট থেকে ১০ ডলারের এলএনজি ২০ ডলারে এবং ৪৫০ ডলারের সার ৮০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সংকুচিত করলেও সরকার ব্যবসায়িক পদ্ধতি সহজ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে সব অশুল্ক বাধা দূর করা হবে।
আলোচনা সভায় ইন্টারন্যাশনল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বর্তমান কর ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কথা বলা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। নিয়মিত করদাতাদের ওপরই করের বোঝা বাড়ানো হয়, অন্যদিকে অনেকে করের আওতার বাইরে থেকে যান। তিনি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং উচ্চ সুদের হার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা তুলে ধরে মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংকই এখন দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে। কঠোর আইন প্রয়োগের অভাবেই এই জীর্ণ দশা। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মনজুর হোসেনও অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে ভঙ্গুর ও মন্দা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘জনতুষ্টিমূলক’ বাজেট এড়িয়ে রক্ষণশীল রাজস্ব নীতি ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা উচিত। এতে সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়লেও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় এটি জরুরি।
আলোচনায় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে ব্যবসায়ীরা ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছেন, যার দায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা নেবেন না। তিনি নতুন করে টাকা না ছাপানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, টাকা ছাপিয়ে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বাড়ালেও প্রকৃতপক্ষে লাভ হবে না; বরং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ বাজারে থাকা অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা নীতিমালের মাধ্যমে বিনিয়োগে আনার দাবি জানান, অন্যথায় এই অর্থ পাচারের ঝুঁকি থাকে।
আলোচনায় ব্যবসায়ীরা একটি সুষম ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা মনে করেন, শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোই হবে আগামী বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। অনুষ্ঠানে আইসিএমএবি সভাপতি মো. কাউসার আলম, ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামসহ দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা অংশগ্রহণ করেন।













