বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থিরতা ও খেলাপি ঋণের পাহাড় ডিঙাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ভাবা হচ্ছে ‘সুশাসন’ বা গভার্নেন্সকে। আর এই সুশাসন নিশ্চিত করার প্রধান কারিগর হওয়ার কথা স্বতন্ত্র পরিচালকদের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, তাদের পেশাগত যোগ্যতা এবং নৈতিক অবস্থান নিয়ে এখন গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার আলোচনায় এখন প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—স্বতন্ত্র পরিচালকরা কি আদৌ স্বাধীন, নাকি তাঁরা কেবল পরিচালনা পর্ষদের ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার?
রাজধানীতে আয়োজিত ‘রিস্ক কনফারেন্স অন ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ২০২৬’-এ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন তাঁর নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ায় পর্ষদের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তিনি তার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, এমন কাঠামো পর্ষদের ভেতরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা ‘গ্রুপ পলিটিক্স’ তৈরি করবে এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) এক চরম কঠিন ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে।
মাশরুর আরেফিন প্রশ্ন তোলেন, ১৫ জনের পর্ষদে যদি ৭ জন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকেন, তবে দুই গ্রুপের মধ্যে অনিবার্যভাবেই সংঘাত তৈরি হবে এবং এমডি মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হবেন। তিনি আরও বলেন, আমি নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব সমর্থন করি না। কেবল ব্যাংকগুলোকে লোক দিয়ে পূর্ণ করলেই সুশাসন আসবে না। তাঁর মতে, স্বতন্ত্র পরিচালকরা এসেই যে ‘দেবদূত’ হয়ে যাবেন আর উদ্যোক্তা পরিচালকরা ‘শয়তান’ থাকবেন—এমন ধারণা ভিত্তিহীন। একই বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট ও সমমানের শিক্ষা নিয়ে একজন ব্যক্তি কেবল পদের কারণে রাতারাতি বদলে যাবেন, এটি অসম্ভব।
এবিবির চেয়ারম্যানের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বতন্ত্র পরিচালকদের নির্দিষ্ট তিনটি বিষয়ে পারদর্শী হতে হয়: ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে এই পদের জন্য হার্ভার্ড বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের উপযুক্ত সম্মানীও দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত। মাশরুর আরেফিনের কাছে আসা বিভিন্ন ব্যাংকের এমডিদের তথ্য অনুযায়ী, অনেক স্বতন্ত্র পরিচালকই তাঁদের দায়িত্ব পালনের চেয়ে নিজেদের সুবিধার্থে অন্যের ‘সিভি’ বিলানো এবং বিভিন্ন অংশীজনকে খুশি করতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। প্রফেশনাল যোগ্যতা ও উচ্চমানের নৈতিকতা ছাড়া কেবল সংখ্যা বাড়িয়ে এই তোষামোদি সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এনআরবিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানীয়া উন্নত বিশ্বের ব্যাংক মালিকানার সঙ্গে বাংলাদেশের মৌলিক পার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। জাপান বা আমেরিকার বড় ব্যাংকগুলোতে মালিকানা থাকে বড় বড় কর্পোরেশনের হাতে, কিন্তু তারা বোর্ডে পাঠায় সেই বিষয়ের সবচেয়ে যোগ্য ও দক্ষ প্রতিনিধিদের। সেখানে ব্যক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল ২ শতাংশ শেয়ার থাকলেই কোনো বিশেষ যোগ্যতা বা রেকর্ড ছাড়াই পরিচালনা পর্ষদে বসার সুযোগ পাওয়া যায়।
স্বতন্ত্র পরিচালকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে বসানো হয়, যারা মূলত ‘ভেজিটেরিয়ান’ বা পুতুল পরিচালকের ভূমিকা পালন করেন। এই ‘সার্কাস’ বন্ধ করতে হলে বিশ্বমানের পেশাদারদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য। এনআরবিসি চেয়ারম্যানের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত যোগ্যতার কঠোর মাপকাঠি নির্ধারণ করা না হবে, ততক্ষণ একই রক্ত-মাংসের মানুষ কেবল পদের নাম বদলে বোর্ডে বসলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় মরণব্যাধি হলো ম্যানেজমেন্টের ‘তোষামোদি’ সংস্কৃতি। ব্যাংক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ পর্ষদকে খুশি রাখতে ব্যস্ত থাকেন। আইপিডিসি ফাইন্যান্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান দাউদ শামসের মতে, ব্যাংকিং সংস্কার শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং স্বচ্ছতা ও রিয়ালিস্টিক ডেটা প্রকাশের মাধ্যমেই শুরু হওয়া উচিত। আইপিডিসির উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, ২০০৪-০৫ সালে তাঁদের এনপিএল যখন ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, তখন তাঁরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিপোর্টের অপেক্ষা না করে নিজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে অডিট করে সেই সত্যটি সামনে এনেছিলেন এবং পরবর্তীতে তা ৮ শতাংশের নিচে নামিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত ‘কালেক্টিভ ডিসিশন’ বা যৌথ সিদ্ধান্তই গভার্নেন্সের মূল চাবিকাঠি।
খেলাপি ঋণ বা এনপিএল ব্যবস্থাপনার বর্তমান পদ্ধতিগুলো নিয়েও ব্যাংকারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। বর্তমানে ঢালাওভাবে যে রিস্ট্রাকচারিং বা রিশিডিউলিং করা হচ্ছে, তা আদতে কোনো স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না। মো. আলী হোসেন প্রধানীয়ার মতে, প্রতিটি ঋণের গুণগত মান বিচার না করে কেবল কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর জন্য সময় বাড়িয়ে দিলে চূড়ান্ত ফল শূন্যই থাকে। তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন—‘স্টোলেন অ্যাসেট’ বা চুরি হওয়া সম্পদকে সাধারণ খেলাপি ঋণ থেকে পৃথক করা।
বর্তমানে একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা যিনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ে খেলাপি হয়েছেন এবং একজন ব্যক্তি যিনি বেনামে কয়েকশ কোটি টাকা লুট করে খেলাপি হয়েছেন—উভয়কেই একই আইনে বিচার করা হচ্ছে। এই লুট হওয়া অর্থকে যদি আলাদা ক্রাইটেরিয়ায় ফেলে চিহ্নিত করা না হয়, তবে ব্যাংকিং সেক্টর কখনোই খেলাপি ঋণের গণ্ডি থেকে বের হতে পারবে না। এটি আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ব্যাংকগুলোর রেটিংকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মাশরুর আরেফিনের মতে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের প্রধানতম ঝুঁকি হলো ক্রেডিট রিস্ক এবং লিকুইডিটি রিস্ক। তিনি বলেন, আগে আমরা ৯ শতাংশ খেলাপি ঋণের এক ‘বোকার স্বর্গে’ বাস করতাম। এখন আমরা জানি যে এটি প্রায় ৪০ শতাংশ। এই সত্যটুকু জানতে পারাটাই বিজয়ের ৫০ শতাংশ। তিনি সতর্ক করে বলেন, যখন পর্ষদ লোন ডিসিশনে হস্তক্ষেপ করে, তখন ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ১০০ কোটির লোন কেন দেওয়া হচ্ছে বা কোলাটেরাল ঠিক আছে কিনা—তা বিচার না করেই অনেক সময় এমডিকে চাপ দিয়ে অর্থ ছাড় করানো হয়। এর ফলে বেনামি লোন এবং ‘আইডেন্টিটি-লেস’ ঋণ তৈরি হচ্ছে, যেখানে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে খুঁজে পাওয়াই দায়। এমনকি ব্যাংকের কয়েকশ কোটি টাকার কেনাকাটা বা পারচেস প্রক্রিয়ায় পর্ষদের হস্তক্ষেপকে তিনি একটি ‘দুর্বল ব্যাংকের লক্ষণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
আর্থিক খাতের সংস্কারে ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (NBFI) মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য একটি বড় বাধা। রিজওয়ান দাউদ শামস আক্ষেপ করে বলেন, আইপিডিসি-তে সরকারের শেয়ার থাকা সত্ত্বেও তারা সরকারি আমানত নিতে পারছে না। এছাড়া ব্যাংকের জন্য রাইট-অফ বা ঋণ অবলোপনের নিয়ম সহজ করা হলেও এনবিএফআই-গুলোকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি এখন বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইবার নিরাপত্তা। সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে পর্ষদ সদস্যরা আইটি বা সার্ভার আপগ্রেড করার খরচকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, যা কাস্টমার ডেটা সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে রেগুলেটর বা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে। মাশরুর আরেফিন যেমনটি বলেছেন, ব্যাংকিং হলো জনগণের টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাই এখানে জনগণের প্রতি এক বড় দায়বদ্ধতা রয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য কঠোর ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ, তোষামোদি সংস্কৃতি বন্ধ এবং এমডিদের স্বৈরতান্ত্রিক হওয়া রোধ করতে হবে। প্রকৃত অপরাধী এবং সাময়িক সংকটে পড়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা না হলে এবং পর্ষদে যোগ্য লোক না বসলে ব্যাংকিং সুশাসন অধরাই থেকে যাবে।
অনুষ্ঠানটিতে মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও ডি-নেটের গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া উক্ত সেশনে উপস্থিত ছিলেন এমটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।













