বিপর্যস্ত শিল্পখাত, সার নিয়েও উদ্বেগ, কী করছে সরকার?

EnergyCrisisBD DSJ April 9 2026.jpg
ডিএসজে কোলাজ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। কেবল পোশাকশিল্প নয়, জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের আঁচ লেগেছে সিমেন্ট, ইস্পাত ও ওষুধশিল্পেও। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের বর্তমান নাজুক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে এমন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উৎপাদন কমে যাওয়ার দাবি জানান সংগঠনটির সভাপতি তাসকিন আহমেদ।

‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক ওই আলোচনায় ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছে। দ্রুত আমদানির মাধ্যমে এই সংকট সমাধান করা না হলে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিসিসিআই সভাপতির দেওয়া তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে। এতে সরকারের লোকসান বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। বর্তমানে সংকটের কারণে সিমেন্ট উৎপাদনে প্রতি ব্যাগে খরচ বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং পণ্যবাহী কনটেইনারপ্রতি ৫০০ থেকে চার হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

তাসকিন আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৩০–৩৫ ডলারে উঠে গেছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপছে অর্থনীতির ওপর। রপ্তানি আয়ের তথ্য বলছে, গত মার্চে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। যদিও চলতি অর্থবছরের জুলাই–মার্চ সময়ে খাতটির রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ কমেছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দূর করা একান্ত প্রয়োজন। তিনি এ খাতের এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তার প্রস্তাব দেন। সংগঠনের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি জাহিদুল আলম জানান, সৌরবিদ্যুৎ খাতের যন্ত্রপাতিতে ২৭–৩০ শতাংশ শুল্ক বর্তমানে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

অবশ্য জ্বালানি নিয়ে তৈরি হওয়া এই উদ্বেগ নিরসনে সরকার তৎপরতা শুরু করেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে সরকার প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে এবং নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে এই ভর্তুকি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বৃহস্পতিবার সাংবাদিকতের বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিকদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সরকার জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে এই ভর্তুকি চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, তারপরও বিভিন্ন এলাকায় অনেকে অতিরিক্ত মুনাফার লক্ষ্যে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুতের চেষ্টা করছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে সেই সব অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জ্বালানি তেলের মজুতের অবস্থা জানানোর চেষ্টা করছি। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল মজুত আছে। অতিরিক্ত মজুতের যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি প্যানিক হওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই।

সরকারের পক্ষ থেকে এদিন আরো জানানো হয়, অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে সারাদেশে সাত হাজার ৩৪২টি অভিযানে প্রায় সাড়ে চার লাখ লিটারের বেশি জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে সরকার।

আলোচনায় শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমান এক আশঙ্কাজনক তথ্য দেন। তিনি জানান, আগামী জুন পর্যন্ত কৃষিকাজের জন্য ছয় লাখ টন সারের মজুত প্রয়োজন হলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় চার লাখ টন সারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জ্বালানি খাতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা হ্রাসে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং বিদ্যুৎচালিত যানবাহন বিষয়ক একটি নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা দ্রুত কার্যকর করা হবে।

ব্যবসায়ী নেতারা জানান, বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যার ৯০ শতাংশই পরিবাহিত হয় ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। এই অতিনির্ভরশীলতা কমাতে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের দাবি জানান এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান এবং বিইআরসির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার (অব.)। একই সঙ্গে সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য শুল্কহার হ্রাস এবং স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা প্রদানের দাবি জানান তাঁরা।

ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান এম. মোসাদ্দেক হোসেন ব্যাটারি আমদানিতে অন্তত এক বছরের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধার দাবি জানান। ইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি ‘টাস্কফোর্স’ এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, ইউরোপের দেশগুলো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে এগিয়ে থাকায় তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে এলপিজি সরবরাহের অভাবে দেশে ইতোমধ্যে অনেক স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান প্রকৌশলী মো. সিরাজুল মাওলা।

আলোচনার সমাপনীতে সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে একটি ‘টাস্কফোর্স’ গঠন এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বিশেষ কমিটি তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই কেবল এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top