দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই অসাধু চক্রকে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে ‘ছিনিমিনি’ খেলার সাহস জুগিয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় এই সাহসী সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
সভায় সভাপতিত্বকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দেশের শরিয়াহ বোর্ডগুলোকে এখন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য পূর্ণ আইনি সুরক্ষা প্রদান করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গভর্নর স্পষ্ট করেন যে, ইসলামী ব্যাংকিংকে সঠিক পথে ফেরাতে হলে এই বোর্ডগুলোকে পরিচালনা পর্ষদ বা যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখা অপরিহার্য।
প্রসংগত বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ ব্যাংক কার্যকর ছিল। তবে ২০১৭ সাল থেকে এস আলম গ্রুপের অবাধ লুটপাটের কারণে গত বছর ৫টি ব্যাংক প্রায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হলে সেগুলো একীভূত বা মার্জ হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংকের জন্ম হয়। সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তারল্য সহায়তা নিয়ে এই নতুন ব্যাংকটি বর্তমানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল ও নজিরবিহীন অর্থপাচারের গুরুতর তদন্ত চলছে। বিএফআইইউ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্যমতে, শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে এই গ্রুপটি আত্মসাৎ করেছে আরও ৬২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটির আমানতের প্রায় পুরোটাই গিলে খেয়েছে এস আলম গ্রুপ। সবমিলিয়ে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি, এসআইবিএল, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো আরও জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমন এক ভয়াবহ লুণ্ঠনের প্রেক্ষাপটেই আলেম-উলামারা আর্থিক অপরাধকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁরা দাবি করেন, ব্যাংকিং খাতে যারা এমন বড় ধরনের লুটপাটে জড়িত, তাদের অপরাধকে সাধারণ জালিয়াতি হিসেবে না দেখে ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে বিচার করতে হবে।
গভর্নর আলেমদের এই উদ্বেগের সাথে একাত্মতা পোষণ করে স্বীকার করেন যে, অতীতে যথাযথ তদারকির অভাব এবং শরিয়াহ বোর্ডগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণেই এস আলমের মতো চক্রগুলো ভয়াবহ অর্থপাচার ঘটাতে পেরেছে। তিনি বলেন, “শরিয়াহ বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলে এবং তাদের তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে কেউ ব্যাংকের অর্থ পাচার করার সাহস পেত না।” এই সুরক্ষা নিশ্চিত হলে ব্যাংকিং খাতের হারানো আস্থা পুনরায় ফিরে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা সভায় বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং মূলত সম্পদভিত্তিক হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। এই সুযোগে একটি অসাধু গোষ্ঠী আমানতকারীদের অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে। এই লুটপাট ঠেকাতে তাঁরা অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়নের দাবি জানান। এই আইনের আওতায় অপরাধীদের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আদলে সম্পন্ন করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের তদারকির জন্য একজন আলাদা ‘ডেপুটি গভর্নর’ নিয়োগ এবং পৃথক ‘কমপ্লায়েন্স বিভাগ’ গঠনের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শরিয়াহ বোর্ডগুলোকে যদি আইনি ক্ষমতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি সুরক্ষা দেওয়া হয়, তবে ব্যাংকগুলোর ভেতরের অনিয়ম শুরুতেই ধরা পড়বে। বিশেষ করে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত তিন সদস্যের শরিয়াহ সাব-কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতী শাহেদ রহমানী, ড. মুফতী ইউসুফ সুলতানসহ দেশের খ্যাতিমান স্কলাররা অংশ নেন। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আলোচনা শেষে আশ্বস্ত করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন থেকে শরিয়াহ বোর্ডগুলোর ‘গার্ডিয়ান’ বা অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে এবং তাদের প্রতিটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইনি ঢাল হিসেবে পাশে থাকবে।













