বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা মাঝপথে মুলতবি করা হয়েছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত একনেকের কার্যতালিকায় ১৯টি প্রকল্প থাকলেও তালিকার অষ্টম প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলাকালেই সভাটি স্থগিত করা হয়। মূলত প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ সময় নিয়ে যাচাই-বাছাই এবং পরবর্তীতে অন্য একটি জরুরি সভা থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এবারের একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ও সতর্ক অবস্থান লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে তালিকার এক নম্বর ও চার নম্বরে থাকা ‘করতোয়া নদীর সিস্টেম উন্নয়ন’ এবং ‘অংশীদারিত্বমূলক পল্লী উন্নয়ন ৪র্থ পর্যায় (পিআরডিবি-৪)’ প্রকল্প দুটি অনুমোদন না দিয়ে সরাসরি ফেরত পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্পটি নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা হলেও প্রকল্পের কার্যকারিতা ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে প্রধানমন্ত্রী এটি অনুমোদন করেননি।
সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় মোট ৫টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার মধ্যে তিনটি সংশোধিত এবং দুটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোতে মোট ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৮৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৯০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৯২ কোটি ৬ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জনগুরুত্বহীন বা অস্পষ্ট কোনো প্রকল্প তিনি গ্রহণ করবেন না।
অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৩৬৮ কোটি টাকা ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছে ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২’-এর। এ ছাড়া ‘চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট-৪’ প্রকল্পটিতে ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয় কমিয়ে সংশোধন করা হয়েছে। অন্যদিকে ১১৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ‘দেশের ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ’ প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন অনুমোদন করা হয়েছে।
সভায় আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ চতুর্থবারের মতো এবং ১৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ের গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ দ্বিতীয়বারের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে সভা মুলতবি হওয়ার কারণে কার্যতালিকায় থাকা অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের আলোচনা ঝুলে গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলাবিশিষ্ট নতুন অফিস ভবন নির্মাণ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অন্যতম।
মুলতবি হওয়া প্রকল্পগুলোর তালিকায় আরও ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসিক নিবাস নির্মাণ, ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প। এ ছাড়া বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর জাতীয় মহাসড়ক প্রশস্তকরণ, রাঙ্গামাটি নদীর ওপর গোমা সেতু নির্মাণ এবং সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজগুলো নিয়ে আগামী একনেক সভায় আলোচনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
একনেক তালিকার বাইরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ১ হাজার ১৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘নগরবাসীর জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা ছিল। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ১৭০টি নগর স্বাস্থ্য নীড় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া এনবিআরের কাস্টমস আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত একটি সংশোধিত প্রস্তাবও পরবর্তী সভার অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি বর্তমান সরকারের প্রথম একনেক সভা হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি প্রকল্পের খুঁটিনাটি জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছেন। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর এই দীর্ঘ চুলচেরা বিশ্লেষণ আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। কার্যতালিকায় থাকা বাকি প্রকল্পগুলো এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীর অনুমোদিত ৩৩টি প্রকল্প পরবর্তী একনেক সভায় অবহিতকরণের জন্য উপস্থাপন করা হবে।













