আগামী ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে ব্যাপক ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। রবিবার (৫ এপ্রিল) শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই উত্তরণ ঘটলে দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
জাতিসংঘের এই স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ‘ইউএন-ওএইচআরএলএলএস’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়সহ উত্তরণের তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হলেও অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের কারণে দেশটির ‘রেডিনেস’ বা প্রস্তুতি এখন খুবই দুর্বল। বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্য, ব্যাংকিং খাত এবং ঋণের বোঝার মতো বিষয়গুলো বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের ওপর ১২ শতাংশ হারে ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপিত হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৪৪ শতাংশই যায় ইইউ বাজারে। এই শুল্ক আরোপের ফলে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা দেশের পোশাক খাতকে বড় ধরনের সংকটে ফেলতে পারে।
জাতিসংঘের এই অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট অত্যন্ত গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি। এই বিশাল খেলাপি ঋণের কারণে আর্থিক খাত বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারছে না, যা উত্তরণ পরবর্তী অর্থনৈতিক খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার নাজুক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে সরকারের আয় বা রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৬.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই সরকারের মোট আয়ের প্রায় ৩১ শতাংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতিকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। লজিস্টিক খরচ জিডিপির ১৬ শতাংশ হওয়া এবং বন্দর ও কাস্টমস অব্যবস্থাপনা উৎপাদন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়েছে। ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়ায় শ্রমবাজার এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এলডিসি থেকে বের হওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।
দেশের এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ কমিটির কাছে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে। প্রতিবেদনটি উপস্থাপনকালে অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ও ড. ড্যানিয়েল গে জানান, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মানদণ্ড পূরণ করলেও বাস্তব প্রস্তুতির যে ঘাটতি রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে জরুরি সংস্কার ও প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, আজকের অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, কূটনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা এবং শিক্ষাবিদগণ উপস্থিত ছিলেন। সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন যে, উন্নয়ন টেকসই করতে হলে উত্তরণের চেয়ে এখন অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ।













