নথিতে কমেছে মূল্যস্ফীতি, ফেরেনি ভোক্তার স্বস্তি

ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ

পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামের চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমেছে, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র এবং ভোক্তার পকেটের অবস্থার সঙ্গে সরকারি এই পরিসংখ্যানের মিল নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে ৮.২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.৩ শতাংশ। অথচ মার্চের প্রায় পুরোটা সময় ছিল রমজান মাস, যখন চিনি, ডাল, তেল, ছোলা এবং শাকসবজির দাম গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সাধারণ ভোক্তাদের প্রশ্ন—বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন কোন জাদুবলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এক মাসের ব্যবধানে ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি কমে গেল? অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিবিএস-এর তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া অথবা বাজার যাচাইয়ের পদ্ধতিতে বড় ধরনের গলদ থাকতে পারে।

ব্যবসায়ীদের কৌশলের কারণেও পরিসংখ্যানে এমনটি হতে পারে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি। তিনি ডিএসজেকে বলেন, “রমজানের ঠিক আগে অসাধু সিন্ডিকেটগুলো কৌশলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় মার্চ মাসের পরিসংখ্যানে নতুন করে বড় কোনো উল্লম্ফন দেখা যায়নি। মূলত গত বছরের মার্চের উচ্চমূল্যের তুলনায় এবারের বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই বিবিএস-এর এই নিম্নমুখী হিসাব তৈরি হয়েছে।” তবে এক মাসের সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সূচক নয়; বরং প্রকৃত স্থিতিশীলতা বুঝতে হলে টানা কয়েক মাস এই প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে ইরান কৌশলগতভাবে ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহনের এই রুটটি অচল হয়ে পড়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর এর চরম প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার আগামী মাস থেকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে, যা পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ড. মুস্তফা কে. মুজেরি আরও সতর্ক করে বলেন, “অভ্যন্তরীণ বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা সম্ভব না হওয়ায় এবং বৈশ্বিক অস্থিরতায় সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে কমার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করবে।”

বিবিএস-এর তথ্যে দেখা যায়, গত মাসে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়েছে। মার্চে গ্রাম এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭২ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ছিল ৮.৬৮ শতাংশ। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, টিসিবি বা ওএমএস-এর ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ লাইনই বলে দিচ্ছে বাজারের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, যা বিবিএস-এর এই ৮.৭১ শতাংশের হিসাবে প্রতিফলিত হয়নি। যদিও সরকার রমজান উপলক্ষে খেজুরসহ কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মাংস ও ডিম বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু খোলাবাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা এবং ‘স্ট্যান্ডিং ডি্পোজিট ফ্যাসিলিটি’ (এসডিএফ) হার কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করার মতো কিছু আর্থিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব উদ্যোগের কোনো সুফল এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

মজুরি বৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে চরম বৈষম্য। মার্চে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার সামান্য বেড়ে ৮.০৯ শতাংশ হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির হারের (৮.৭১ শতাংশ) চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুতগতিতে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা বিবিএস-এর তথ্যে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top