২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। নির্বাচনের ঠিক আগের দুই মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।
মূলত নির্বাচনী প্রচারণা, সাংগঠনিক খরচ এবং ভোটারদের যাতায়াতসহ বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংক থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মানুষের হাতে নগদ টাকা ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকায়। বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত ছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও, যেখানে মাসের ব্যবধানে আরও ৭ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা বেড়ে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। টানা পাঁচ মাস ব্যাংকমুখী হওয়ার প্রবণতা থাকলেও বছরের শেষ সময় থেকে মুদ্রাবাজারের চিত্র উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা এবং সাংগঠনিক কাজে বড় অঙ্কের নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও নির্বাচনী তদারকি ও ব্যবস্থাপনার কাজে বড় ধরনের ব্যয় করে থাকে। এসব খরচের সিংহভাগই নগদ টাকায় সম্পন্ন হওয়ায় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের হিড়িক পড়ে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় বহু মানুষ কর্মস্থল ছেড়ে নিজ গ্রামে ফেরায় ব্যক্তিগত ও যাতায়াত ব্যয় মেটাতেও বাড়তি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
নির্বাচনী ডামাডোলের পাশাপাশি ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়াকেও নগদ টাকা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফি ও আনুষঙ্গিক খাতের ব্যয় মেটাতে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ ব্যাংক থেকে জমানো টাকা তুলে নিয়েছেন। একই সাথে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পরপরই রোজা শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাকাটাও বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, এবারের নির্বাচন উৎসবমুখর হওয়ায় যাতায়াত ও পারিবারিক খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রচারণা ও সাংগঠনিক খাতে নগদ অর্থের ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন বছরের শিক্ষা ব্যয় ও রোজার পূর্বপ্রস্তুতি—সব মিলিয়েই এই দুই মাস ব্যাংক বহির্ভূত টাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক বিশেষ খরচগুলোর সমন্বয়েই বাজারে এই তারল্য প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
মজার বিষয় হলো, মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বাড়লেও বাজারে মুদ্রা সরবরাহের (রিজার্ভ মানি) পরিমাণ আবার কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকার স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা জানুয়ারিতে কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমেছে ১৮ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। রিজার্ভ মানির এই সংকোচন বাজারে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশলী পদক্ষেপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে অনিয়ম ও আস্থার সংকটের কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ফিরতে শুরু করায় মানুষ আবার ব্যাংকে টাকা জমা দিতে শুরু করেছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রবণতা ইতিবাচক থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই চিত্র সাময়িকভাবে বদলে গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনের রেশ কেটে গেলে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে এই টাকা আবার ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে আসবে। সাধারণত বড় কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক উৎসবের পর মানুষের হাতে থাকা বাড়তি টাকা পুনরায় আমানত হিসেবে ব্যাংকে জমা হওয়ার নজির বাংলাদেশে সব সময়ই ছিল। এখন দেখার বিষয়, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের প্রতিবেদনে মুদ্রাবাজারের এই প্রবাহ পুনরায় ব্যাংকের ভেতরে ঢোকে কি না।













