বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের (আরএমজি) আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির কারণে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের মার্চে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। অবশ্য ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চে রপ্তানি আয় প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছিল ৩৫০ কোটি ডলারের পণ্য, যা মার্চের তুলনায় মাত্র ০.৪২ শতাংশ কম।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির পর থেকে পরবর্তী আট মাস ধরেই নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে। প্রতি মাসেই রপ্তানি আয় কমছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সময়ে মোট ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি ডলার। সেই হিসাবে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি আয়ে ৪.৮৫ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মূলত তৈরি পোশাক খাতের আয় কমে যাওয়াই সামগ্রিক রপ্তানিতে এই বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে গত মার্চে আয় হয়েছে ২৭৮ কোটি ডলার। অথচ গত বছরের মার্চে এই আয় ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯.৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে আয় ২১.২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪২ কোটি ডলারে এবং ওভেন খাতে ১৭.৩২ শতাংশ কমে আয় হয়েছে ১৩৬ কোটি ডলার। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এই খাতে মোট রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৮৫৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৫১ শতাংশ কম।
রপ্তানি খাতের এই নাজুক পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত অতীতে কখনো এমন দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখোমুখি হয়নি। তিনি জানান, এই পরিস্থিতির শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের ধাক্কায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তখনই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের তৈরি হয়েছে। এই সংকট এখন বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা শিল্পোৎপাদনকে সরাসরি ব্যাহত করছে।
মোহাম্মদ হাতেম আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার অস্থির হওয়ায় বাংলাদেশেও ডিজেলে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রপ্তানি খাতের এই সংকট মোকাবিলায় তিনি সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে বলেন, শিল্পকারখানায় জ্বালানি তেল সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি চলমান ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে খুব দ্রুত কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রদান করা জরুরি।
তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যসহ বেশির ভাগ প্রধান খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও, হিমায়িত মাছ, কাঁচা চামড়া এবং প্রকৌশল পণ্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা গেছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এর ফলে বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অনেক ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল করছেন, যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।













