বস্ত্র ও পাট খাতের ভ্যালু চেইন শক্তিশালীকরণ এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবন সংক্রান্ত এক উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তুরস্ক যাচ্ছে বাংলাদেশের আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।
তবে তুরস্কের ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির (আইটিইউ) এই বিশেষায়িত কোর্সে মনোনয়নের ক্ষেত্রে কারিগরি বিশেষজ্ঞ বা প্রযুক্তিবিদদের চেয়ে সচিবালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
আর এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে; প্রযুক্তির এই পাঠ কি আদৌ মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে, নাকি এটি কেবলই একটি ‘এক্সপোজার ভিজিট’ বা প্রমোদ ভ্রমণে সীমাবদ্ধ থাকবে?
চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ‘স্ট্রেংথেনিং টেক্সটাইল অ্যান্ড জুট ভ্যালু চেইনস: টেকনোলজি, ইনোভেশন অ্যান্ড এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস’ শীর্ষক এই প্রশিক্ষণ কোর্সটি অনুষ্ঠিত হবে। সরকারি আদেশ (জিও) অনুযায়ী, এই সফরের মূল লক্ষ্য বস্ত্র ও পাট খাতের আন্তর্জাতিক রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করানো।
মনোনীত কর্মকর্তাদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৮ জনের মধ্যে ৬ জনই সরাসরি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব, উপসচিব এবং সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা, যারা মূলত প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
এরা হচ্ছেন; বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের যুগ্ন সচিব হাফসা বেগম, উপসচিব সাইফুল ইসলাম আজাদ, সাবিহা ইয়াসমিন, জিল্লুর রহমান, সিনিয়র সহকারি সচিব শেখ আবদুল্লা সাদিদ। এছাড়া ডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইলের পরিচালক (যুগ্ন সচিব) মোহাম্মদ জাহেদুর রহমানও এই প্রশিক্ষনে অংশগ্রহণ করছেন।
এর বাইরে কারিগরি প্রতিনিধি হিসেবে পাট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ( উপসচিব) আনিসুর রহমান এবং বরিশাল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আবদুল কাদের বেপারীকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
বস্ত্র খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোর্সের শিরোনাম যেখানে ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন’, সেখানে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের চেয়ে সেইসব কর্মকর্তাদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত ছিল, যারা সরাসরি কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া বা গবেষণা (আরএন্ডডি) তদারকি করেন।
তুরস্কের মতো উন্নত দেশে এই ধরণের ‘ভ্যালু চেইন’ বা ‘টেকনোলজি’ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে সাধারণত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোলজিস্ট, রপ্তানি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং যারা নতুন উদ্ভাবিত পণ্য (যেমন: পাটের বহুমুখী ব্যবহার) নিয়ে কাজ করছেন এমন রিসার্স ফেলোদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এই পেশাজীবীরা সরাসরি তুরস্কের আধুনিক যন্ত্রপাতি বা টেক্সটাইল প্রযুক্তির প্রয়োগ বাংলাদেশে করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক ভ্যালু চেইন বিশ্লেষণ করে সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের সাথে দরকষাকষিতে দক্ষরাই এই প্রশিক্ষনে উপযুক্ত।
বিপরীতে বাংলাদেশের তালিকায় দেখা যাচ্ছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ উন্নত বিশ্বে নীতিনির্ধারকরা কেবল চূড়ান্ত পর্যায়ের গেজেট বা আইন পর্যালোচনার জন্য যান, প্রযুক্তি শেখার জন্য নয়।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে প্রায়ই ভিন্ন দপ্তরে বদলি হয়ে যান, যার ফলে অর্জিত কারিগরি জ্ঞান মন্ত্রণালয়ে কোনো কাজে আসে না। অথচ যারা সরাসরি টেক্সটাইল মিল বা পাট অধিদপ্তরের কারিগরি উইংয়ে কাজ করেন, তারা বঞ্চিত হওয়ায় উদ্ভাবনী প্রযুক্তি প্রয়োগে দেশ পিছিয়ে পড়ছে।
ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের সাথে আলাপকালে এক বস্ত্র প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যখন একজন যুগ্মসচিব বা উপসচিব ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ‘ভ্যালু চেইন’ শিখতে যান, তখন তিনি ফিরে এসে বড়জোর একটি নোট লেখেন। কিন্তু একজন কারখানার প্রকৌশলী গেলে তিনি সরাসরি মেশিনে সেই প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে পারতেন। আমাদের সিস্টেমে উদ্ভাবন এখন ফাইলের ভেতর বন্দি।
এ বিষয়ে সিপিডির অরিক্তি পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান ডিএসজেকে বলেন, বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রে সরকারের বর্তমান নীতিমালাগুলো স্বচ্ছ নয়। ফলে প্রকৃত যোগ্য বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা যাওয়ার পরিবর্তে এমন ব্যক্তিরা সুযোগ পাচ্ছেন যাদের কাছ থেকে প্রকল্পের কোনো সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এটি ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা ব্যয়ের তুলনায় ফলদায়ক কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বা প্রশিক্ষণ বর্তমানে কেবল রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি চাকরির একটি ‘পুরস্কার’ বা ‘প্রণোদনা’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ করদাতার অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়ছে।
বস্ত্র খাতের উন্নয়ন ও রপ্তানি এখন পুরোপুরি বেসরকারি খাতের অবদান। অথচ এসব খাতের নীতিনির্ধারণী কিংবা প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ পাঠানো হচ্ছে, যা কার্যত অকার্যকর। এখানে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণই বেশি জরুরি বলে মনে করেন তৌফিকুল ইসলাম।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের গত তিন বছরের বিদেশ সফরের একটি পরিসংখ্যান (সরকারি প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই কারিগরি কর্মকর্তাদের তুলনায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা ছিল আকাশচুম্বী।
গত তিন বছরে বস্ত্র ও পাট খাতে যতগুলো ‘টেকনিক্যাল ট্রেনিং’ বা ‘স্টাডি ট্যুর’ হয়েছে, তার গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশই দখল করে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বিপরীতে বস্ত্র অধিদপ্তর, পাট অধিদপ্তর এবং টেক্সটাইল কলেজগুলোর প্রশিক্ষক ও প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণ প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে কমেছে। অথচ উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল দায়িত্বটি তাদেরই।
তুরস্কের ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি একটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে আধুনিক প্রযুক্তির পাঠ নিয়ে আসা দেশের জন্য বড় অর্জন হতে পারতো। কিন্তু প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের প্রোফাইল দেখলে মনে হয়, এটি প্রযুক্তির চেয়ে প্রশাসনের ‘রিওয়ার্ড ভিজিট’ হওয়ার ঝুঁকিই বেশি। ৮ জন কর্মকর্তার এই সফর কি আসলেই পাট ও বস্ত্রের ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করবে, নাকি কেবলই সরকারি নথিতে একটি ‘সফল প্রশিক্ষণ’ হিসেবে ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে; সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।













