দীর্ঘদিন ধরে চলা মন্দার বৃত্ত ভেঙে চাঙ্গা হতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। মূলত আগামী ১২ আগস্ট জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় বাজার সূচক ও লেনদেনে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে।
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার স্থবিরতায় নিমজ্জিত থাকলেও নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই ঊর্ধ্বগতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।
গত দুই দিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ১৭০ পয়েন্ট বা ৩.২৫ শতাংশ বেড়েছে, যার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সাইডলাইনে থাকা বিনিয়োগকারীদের বাজারে ফিরে আসা।
মঙ্গলবার ডিএসইর সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ৮৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫৩৯৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সূচকের এ অবস্থান গত বছরের ৬ অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার নিয়ে বড় প্রত্যাশা তৈরি হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির ঢালাও জরিমানা ও কঠোর অবস্থানের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। ফলে বাজার সংস্কারের চেয়ে মন্দার গভীরতাই বেশি ফুটে ওঠে।
তবে এখন জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসায় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার আশায় বড় বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন শেয়ারে নতুন করে ‘পজিশন’ নিতে শুরু করেছেন। তাদের ধারণা, নির্বাচনের পর উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়বে এবং অর্থনীতির চাকা আবারও সচল হবে, যার সরাসরি সুফল পাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ সময় নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণে ধীরগতি বজায় রাখলেও এখন নতুন সরকার আসার অপেক্ষায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন, যার প্রতিফলন ঘটছে শেয়ারের দামে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বর্তমান এই ঊর্ধ্বগতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ব্যাংক ও বিমা খাত। উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফার মার্জিন বা ‘স্প্রেড’ বাড়ার সম্ভাবনায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন ব্যাংক শেয়ারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ও দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় এই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরেছে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় সবগুলোর দামই বাড়ছে। ফলে গত এক মাসে কেবল ব্যাংক খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান মনে করেন, বর্তমানে শক্তিশালী মৌলভিত্তি সম্পন্ন অনেক বহুজাতিক কোম্পানির আয় কমছে, বিপরীতে অনেক ভালো ব্যাংকের শেয়ার দর বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে। একারণেই মানুষ এখন টেলিকম বা বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ে ব্যাংক শেয়ারে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মঙ্গলবার কেবল ব্যাংক নয়, বরং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাত, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং টেক্সটাইল খাতের শেয়ারের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ডিএসইতে একদিনেই লেনদেন ৭৯০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি।
লেনদেন বৃদ্ধির এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন ঝিমিয়ে পড়া পুঁজিবাজারে প্রাণসঞ্চার করছে। রাজনৈতিক সংযোগ থাকা কিছু কোম্পানির শেয়ার দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও সামগ্রিকভাবে একটি ‘বুলিশ’ ট্রেন্ডে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার।












