পোশাকে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী

ডিএসজে
ডিএসজে

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতার মানচিত্রে ভিয়েতনাম, চীন কিংবা পাকিস্তানের নাম ঘুরে ফিরে আসছিল। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সাম্প্রতিক রূপান্তর সেই সমীকরণকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে সদ্য চূড়ান্ত হওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের নতুন শুল্ক কাঠামো; এই দুই উন্নয়নের সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারতই এখন সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

এই পরিবর্তন কেবল শুল্কহারের পার্থক্য নয়; এটি বাজারে প্রবেশাধিকার, সরবরাহ শৃঙ্খল, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশলের প্রশ্ন।

গত ২০ জানুয়ারিতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চ থেকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, “আমরা কোনো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, আমরা একটি ভাঙনের মুখে।” তার এই সতর্কবার্তা খুব দ্রুতই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। অর্থনৈতিক সংযুক্তি, শুল্কনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খল এখন আর কেবল বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এগুলো কার্যত ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

তার ভাষায়, পুরনো বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসবে না, এ নিয়ে শোক বা স্মৃতিকাতরতায় ভোগা কোনো কৌশল নয়।

এই ভাঙনের সুযোগই কাজে লাগিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত। দীর্ঘ দুই দশক ধরে ঝুলে থাকা ইইউ–ভারত এফটিএ হঠাৎ করেই গতি পায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির ও আক্রমণাত্মক শুল্কনীতির পটভূমিতে। দাভোস সম্মেলনের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়া কাকতালীয় নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতা ভন ডার লিয়েনের ভাষায়, এটি “মাদার অব অল ডিলস।”

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পেট্রোলিয়াম পণ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছাড়া ভারত-ইইউ বাণিজ্য মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণই ছিল। এই এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। ২০২২ সাল থেকে নতুন করে গতি পাওয়ার পর অবশেষে এখন এই চুক্তি বাস্তব রূপ পেল।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, এই এফটিএ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভারত। দেশটির বাজার প্রবেশাধিকার, শ্রম-সুবিধা এবং সম্ভাব্য গতিশীলতার সুযোগের কারণে। তার ভাষায়, “সব মিলিয়ে ভারতের জন্য এটি স্বর্ণযুগ হতে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ইইউ বৈশ্বিকীকরণে আরও গভীরভাবে বিনিয়োগ করছে, ঠিক সেই সময়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রে বৈশ্বিকীকরণের কিছু সমস্যা ঠিক করার চেষ্টা করছি।”

এই চুক্তির আওতায় ইইউ ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক প্রত্যাহার করবে, যা সাত বছরের মধ্যে ৯৩ শতাংশে পৌঁছাবে। টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি স্বার্থ সবচেয়ে গভীর। সেখানে ভারতের ওপর আগে ৯ থেকে ১২ শতাংশ যে শুল্ক ছিল, তা ধীরে ধীরে শূন্যে নেমে আসবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) স্কিমের আওতায়, এলডিসি মর্যাদার কারণে। কিন্তু এই সুবিধা সময়সীমাবদ্ধ। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তিন বছরের অন্তর্বর্তী সময় শেষে, অর্থাৎ ২০২৯ সালের নভেম্বরে, এই শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ হয়ে যাবে।

সেই সময়ে বাংলাদেশ যদি জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে বা আলাদা কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক আবার ৯–১২ শতাংশে ফিরে আসবে। আর তখনই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সরাসরি ও অসম হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সম্প্রতি একটি ব্যাপক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার ও ইইউ চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের সঙ্গে বৈঠকও করেন।

সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের মেয়াদ আসন্নভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে মুহাম্মদ ইউনূস জাপানের সঙ্গে সম্প্রতি বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত রপ্তানি চুক্তি অর্জনের সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন এবং ইউরোপের সঙ্গে অনুরূপ ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দেন।

Bangladesh textiles industry

জেফারিজের ইকুইটি গবেষণা অনুসারে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতি বছর প্রায় ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বস্ত্র ও পোশাক আমদানি করে, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক ও কাপড়ের বাজারে পরিণত করেছে। ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট ট্যারিফ লাইনের ৯৭ শতাংশে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে, যা বাণিজ্য মূল্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এর ফলে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ইউরোপে ভারতীয় রপ্তানির প্রায় ৯১ শতাংশের ওপর কোনো আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য হবে না। এর বিনিময়ে ভারত পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯৭ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক কমাবে। ফলে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের চার বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি শুল্ক সাশ্রয় হবে।

বাংলাদেশের ঝুঁকি এখানেই গভীর। দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। ২০২৪ সালে ইইউতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল টেক্সটাইল ও পোশাক পণ্য। সর্বশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৮ শতাংশ গ্রহণ করেছে ইউরোপ।

দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ২২ বিলিয়ন ইউরোর বেশি, যেখানে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ভোগ করে। ফলে ইইউ যদি সোর্সিং কৌশলে সামান্যও পরিবর্তন আনে, তার প্রভাব ঢাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান ও শিল্প স্থিতিশীলতায় বহুগুণে প্রতিফলিত হবে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, ইইউ থেকে অর্ডার যদি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশও কমে যায়, তাহলে পুরো পোশাক খাত অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। অধিকাংশ কারখানা অত্যন্ত কম মুনাফায় পরিচালিত হয় এবং নিয়মিত অর্ডার প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল।

ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রতিযোগিতার চিত্র বাংলাদেশের জন্য অনুকূল নয়। সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রায় ১৮ শতাংশে নামিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার প্রায় ২০ শতাংশ।

এই দুই শতাংশের ব্যবধান শুনতে সামান্য মনে হলেও, অত্যন্ত মূল্য-সংবেদনশীল বেসিক পোশাকের বাজারে এটি বড় পার্থক্য তৈরি করে। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র; দুই প্রধান বাজারেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ভারতের শক্তি শুধু শুল্ক সুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির ‘কটন-টু-গার্মেন্ট’ সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং কৌশলগত বাণিজ্য কূটনীতি একে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে।

ইইউ-ভারত এফটিএর ফলে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো শুল্ক-প্রিমিয়াম ছাড়াই ভারতে অর্ডার বৈচিত্র্য আনতে পারবে। একই সঙ্গে সরবরাহ সময় কমানো, ঝুঁকি হ্রাস এবং ‘চায়না+১’ কৌশলে বাংলাদেশ নয়, ভারতকে বেছে নেওয়ার প্রণোদনাও বাড়বে।

তবু এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অবধারিত পরাজয়ের বার্তা নয়। বরং এটি একটি রূপান্তরের চাপ। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ইতিমধ্যেই টেকসই উৎপাদন ও কমপ্লায়েন্সে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে। বিশ্বের ১০০টি এলইইডি-সার্টিফায়েড সবুজ পোশাক কারখানার মধ্যে ৬৯টিই বাংলাদেশে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা বলছেন, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের কারখানাগুলো আকারে বড়, সুসংগঠিত এবং পরিবেশ ও শ্রম মানদণ্ডে অনেক বেশি পরিণত। ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা তাই কেবল মূল্যের ওপর নির্ভর করবে না; দ্রুত ডেলিভারি, জটিল পণ্যের সক্ষমতা, ট্রেসেবিলিটি ও টেকসই উৎপাদনই হবে মূল পার্থক্য।

রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষতির আশঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশের কিছু সুবিধা রয়েছে বলে মনে করেন বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ। তার মতে, নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা এবং ডেনিম, সোয়েটার, টি-শার্ট, ট্রাউজার, আন্ডারগার্মেন্টস ও ওভেন শার্টের মতো পণ্যে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান আছে।

একই সঙ্গে নীতিগত পর্যায়ে বাংলাদেশকে দ্রুত জিএসপি প্লাসের ৩২টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন পূরণ, ইইউর সঙ্গে চলমান কমপ্রিহেনসিভ পার্টনারশিপ অ্যান্ড কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট (পিসিএ) আলোচনাকে বাণিজ্য চুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়া এবং উচ্চমূল্যের পণ্য ও ম্যান-মেইড ফাইবারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ইইউ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্যিক শ্রেণিবিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ এতদিন অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার ও শ্রমঘন উৎপাদনের ওপর ভর করে বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান গড়ে তুলেছিল।

এখন সেই অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হবে এমন এক প্রতিবেশীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যে ইতোমধ্যেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র; দুই প্রধান বাজারেই নিজের জন্য কৌশলগত মহাসড়ক নিশ্চিত করেছে। এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আর কোনো দূরবর্তী দেশ নয়, ভারতই এখন সেই চ্যালেঞ্জের নাম।

একই দশা ভারতের আরেক প্রতিবেশি পাকিস্তানের জন্যও। ইইউর সঙ্গে ভারতের চুক্তির ফলে ইসলামাবাদের বস্ত্র রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা সৃষ্টি করতে পারে বলে সেখানকার ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন। ইসলামাবাদের জন্য ইউরোপ তাদের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডনের প্রতিবেদনে এক ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “ভারত এখন অর্থনৈতিক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে।” তিনি এভাবেই ভারত-ইইউ এফটিএর প্রভাবকে ব্যাখ্যা করেছেন।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top