চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আজ বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা দিয়েছে।
বিকালে বন্দর ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক শেষে পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর সাংবাদিকদের জানান, রমজান মাসের বাস্তবতা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শুক্রবার ও শনিবার কর্মসূচি বন্ধ রাখা হবে। এই সময়ের মধ্যে সরকার তাদের দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত জানাবে, এমন আশ্বাস মিলেছে বলে তিনি জানান।
তবে শনিবারের মধ্যে কোনো অগ্রগতি না হলে রবিবার থেকে পুনরায় আন্দোলন শুরু হবে বলেও সতর্ক করেছেন পরিষদের নেতারা।
এই সংকটের শুরু নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে ঘিরে।
বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে শুরু হওয়া কর্মবিরতি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বিস্তৃত রূপ নেয়।
প্রথমে শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে আংশিক কর্মবিরতি চললেও মঙ্গলবার থেকে টানা কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। পণ্য খালাস ও জাহাজ পরিচালনায় স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছান। বন্দরের চার নম্বর গেটের বাইরে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি পরে তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকনের ভাষ্য, উপদেষ্টা সরাসরি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের ক্ষমতা রাখেন না বলে জানিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপিওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না। বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে পদত্যাগ করতে হবে এমন দাবিও তোলা হয়েছে উপদেষ্টার কাছে।
আন্দোলনকারীদের আরেকটি প্রধান দাবি, ধর্মঘটে অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার নিয়েও ইতিবাচক আশ্বাস মিলেছে।
তবু অনিশ্চয়তা কাটেনি। শ্রমিক নেতারা বলছেন, দুই দিনের এই বিরতি কেবল আস্থার পরীক্ষা। সরকারের পদক্ষেপ যদি তাদের প্রত্যাশা পূরণ না করে, তাহলে বন্দর আবারও অচলাবস্থার দিকে যেতে পারে।
এদিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “চুক্তি বোধ হয় ঠেকানো যাবে না। তবে দেশের ক্ষতি করে কোনো চুক্তি হবে না।
“রোজার আগে বন্দর বন্ধ করে এ ধরনের আন্দোলন অত্যন্ত অমানবিক। বন্দর বন্ধ রাখার কারও কোনো এখতিয়ার নেই। বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যেতে পারবে। কাল সকাল থেকে সচল না হলে সরকার হয়তো অন্যভাবে দেখবে।”
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত এই বন্দর ঘিরে যে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তা বিবেচনায় সমাধানের চাপ এখন স্পষ্টতই ঢাকার নীতিনির্ধারকদের ওপর।
চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দিয়েই মূলত বন্দরের বেশির ভাগ কনটেইনার ওঠানামা হয়।
গত অর্থবছরে আমদানি রপ্তানির মোট কনটেইনারের প্রায় ৯৭ শতাংশ এই তিন টার্মিনাল দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। বাকি ৩ শতাংশ পরিচালনা করছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে পরিচালিত আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনাল, যা ২০২৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে।
বন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রমের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ এনসিটি টার্মিনালেই সম্পন্ন হয়। এই প্রস্তুত টার্মিনালটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই মূলত শ্রমিকদের আপত্তি ও আন্দোলন শুরু হয়। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে করা একটি রিটে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হলেও হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেয়। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে দ্বৈত বেঞ্চে বিভক্ত রায় হয়েছিল। তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে রিট ও রুল বাতিল হয়। ফলে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল বরাদ্দ দেওয়ার পথে আর আইনগত বাধা নেই। এমন প্রেক্ষাপটেই চট্টগ্রাম বন্দরে আন্দোলন শুরু হয়।













