“গত সপ্তাহে গ্যাস কিনেছি আড়াই হাজার টাকায়, এখন তো টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না। এদিকে কোথাও সিলিন্ডার নাই।”
বিবিসিকে কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মাসুদুল হাসান। তার এই বক্তব্যেই স্পষ্ট দেশের এলপিজি গ্যাস সংকটের চিত্র।
এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশ; নেপাল ও ভারতের কিছু অংশেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে তাকালে দেখা যায়, এলপিজি সংকট এখন একটি বড় ভূরাজনৈতিক গল্পের অংশ।
বাংলাদেশের বাজার ও সরবরাহ সংকট
বাংলাদেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা এখন প্রায় ১৭ লাখ টন। বার্ষিক বাজারের আকার ২০ হাজার কোটি টাকা প্রায়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত তিন বছরের এলপিজি আমদানির তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে দেশে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়। পরের বছর ২০২৪ সালে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ১০ হাজার টনে। কিন্তু ২০২৫ সালে আমদানি আবার কমে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে নেমে আসে।
চাহিদা অনুযায়ী আমদানি বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ফলে বছরের শেষে যে পরিমাণ মজুত থাকার কথা ছিল, সেটিও বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে। এরপরও বাজারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ভোক্তা দ্বিগুণ দাম দিয়েও এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
ফলে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এলপিজি আমদানির উৎস খুঁজতে শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে প্রথমবারের মতো এলপিজি আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি দেশে গত ২১ ও ২৪ জানুয়ারি চিঠি পাঠিয়েছে বিপিসি।
বাংলাদেশে বর্তমানে এলপিজির সংকট সরবরাহজনিত বলে মনে করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তার মতে, গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৭০টি জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ছিল। ডিসেম্বরে আরও ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। চীনের মতো বড় ক্রেতারাও এখন বৈশ্বিক এলপিজি বাজার থেকে কিনছে। তাই এলপিজি কেনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
অবশ্য এই সংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক। তিনি বলেন, লোয়াবের পাঁচটি সদস্য কোম্পানি এক বছর আগেই এলপিজি আমদানি বাড়ানোর অনুমোদন চেয়েছিল। কিন্তু এক বছর পর মন্ত্রণালয় চিঠির জবাবে জানায়, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী এই অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর গত আগস্টে আবারও মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। নতুন এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমোদন চাওয়া হলেও এখনো তা দেওয়া হয়নি।

প্রতীকী ছবি
দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত চিত্র
নেপালেও চলছে এলপিজি সংকট। দেশটির সরকারি সংস্থা নেপাল অয়েল করপোরেশন এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক বললেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। হিমালয়ান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল গ্যাস টানা দুই সপ্তাহ বিক্রয় ডিপোতে সরবরাহ দিতে পারেনি। খালি সিলিন্ডার হাতে মানুষ কোম্পানির অফিসে ভিড় করছে।
কাঠমান্ডুর নিউ বাস পার্ক এলাকা থেকে খালি সিলিন্ডার নিয়ে কার্যালয়ে আসা নামরাজ ঘিমিরে তার ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “বাসায় গ্যাস একেবারেই শেষ। ডিপোতে গ্যাস দেয় না। ডিপোর লোকজন বলেছে, কোম্পানির অফিসে সরাসরি গেলে নাকি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। তারা আমাকে ডিপোতে ১০–১৫ দিনের একটি অপেক্ষমান তালিকায় রেখেছিল, কিন্তু আমার পালা আসেনি। এতদিন অপেক্ষা করতে হবে শুনে আমি সরাসরি বালাজু শিল্প এলাকার অফিসে এসেছি। কিন্তু আজ দেওয়া হয়নি। আমরা এখন পুরোপুরি অসহায়।”
ভারতের সংকট সার্বিক নয়, তবে মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীরে রিফাইনারি বন্ধ থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে এলপিজি সংকট রয়েছে। সংকট থেকে মুক্তি পেতে ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে গত বছরের ১৭ নভেম্বর নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি এলপিজি চুক্তি হয়। ওই চুক্তি অনুসারে চলতি বছরে প্রায় ২২ লাখ টন এলপিজি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনবে ভারত।
এলপিজি ও নতুন জ্বালানি মানচিত্র
এই আঞ্চলিক সংকটের পেছনে একটি বড় পরিবর্তন কাজ করছে, বিশ্বের নতুন জ্বালানি মানচিত্র। এলপিজি, যা একসময় তুলনামূলকভাবে অবহেলিত ছিল, এখন আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় কৌশলগত জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি এটি অনেক অঞ্চলের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।
এলপিজি মূলত প্রোপেন ও বিউটেন নামের দুটি গ্যাস দিয়ে তৈরি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন জ্বালানি। এলপিজির বৈশ্বিক বাজার এখন ১৭৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অপরিশোধিত তেল বা এলএনজি খাতের তুলনায় এই বাজার আকারে ছোট হলেও, উন্নয়ন ও জলবায়ু প্রেক্ষাপটে প্রতি টন এলপিজির মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভূরাজনীতি বিষয়ক ওয়েবসাইট জিওপলিটিক্যাল মনিটরের প্রতিবেদন বলছে, এলপিজি এখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। প্রশ্নটা আর শুধু দাম বা সরবরাহ নয়। কে নির্ভরযোগ্যভাবে জ্বালানি দিতে পারছে, সেটিই প্রভাব বিস্তারের মূল চাবিকাঠি।
যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ও করপোরেট মধ্যস্থতাকারীরা
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি খুব দ্রুত এলপিজি উৎপাদনে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূল এখন অনেক দেশের জন্য লাইফলাইনের মতো। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি দারিদ্র্যে ভুগছে, তাদের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
জেনেভাভিত্তিক বিগিএন গ্রুপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের এলপিজির সবচেয়ে বড় একক ক্রেতা। আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান হলো পেট্রেডেক। তারা বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন এলপিজি কেনাবেচা করে। এই কারণে পেট্রেডেককে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাধীন এলপিজি ব্যবসায়ী বলা হয়।
এই কোম্পানিগুলো এখন বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের এলপিজি এশিয়া ও আফ্রিকার দিকে পাঠাচ্ছে।
এলপিজি নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ীরা, সরাসরি রাষ্ট্র নয়। ফলে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা পরিবহন সংকটে কার্যত ‘শক অ্যাবজরবার’ হিসেবে কাজ করছে কোম্পানিগুলো। লোহিত সাগর বা পানামা খালে সমস্যা হলে তারা রুট বদলায়, বাজারে সরবরাহ ধরে রাখে। ফলে তাদের সিদ্ধান্তের সরাসরি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব পড়ে।
বিগিএন, পেট্রেডেক ও সুইসকেমগ্যাসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো খুব নমনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চল বা আরব উপসাগর থেকে এলপিজি অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নিতে পারে। যেখানে সংকট সবচেয়ে বেশি, সেখানে দ্রুত সরবরাহ পাঠানো হয়। তাদের সিদ্ধান্তের সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে। কিছু উন্নয়নশীল দেশে এলপিজির সংকট মানে খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিই বলে দেয় হঠাৎ করে কূটনীতিতে এলপিজির গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণ। ২০২৫ সালে জি-২০ দেশের নেতারা এলপিজিকে বড় সমাধান হিসেবে সমর্থন দেন। আফ্রিকায় পরিচ্ছন্ন রান্নার সংকট দ্রুত সমাধানের জন্য এটিকে সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলা হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ ধারণা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পরিচ্ছন্ন রান্নার নতুন সুযোগের প্রায় অর্ধেক আসবে এলপিজি থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোও এই পথে এগোচ্ছে। বিশেষ করে ‘পাওয়ার আফ্রিকা’ প্রকল্প সৌরশক্তি ও এলপিজি একসঙ্গে ব্যবহারের ব্যবস্থা সমর্থন করছে। তারা প্রোপেনকে নিরাপদ, দক্ষ ও সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে দেখছে। বেশি দূষণকারী ঘরোয়া জ্বালানির বদলে এলপিজিকে ভালো বিকল্প বলা হচ্ছে।
বৈশ্বিক দক্ষিণে প্রভাব বাড়ানো নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা চলছে। এই অবস্থায় কম দূষণকারী ও সাশ্রয়ী জ্বালানি দিতে পারা যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি কূটনৈতিক শক্তি দিচ্ছে।
তবে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্থিতিশীল হলে ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ বৈধ কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় ফিরে আসলে দেশটি বছরে ৪ থেকে ৬ মিলিয়ন টন এলপিজি বাজারে সরবরাহ করতে পারে। এতে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাণিজ্য প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হতে পারে এবং জাহাজ পরিবহনের সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
পরিবেশ, নীতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
এলপিজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি পরিবেশের জন্য তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। একই পরিমাণ শক্তি তৈরি করতে প্রোপেন কয়লার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। এলপিজিতে প্রায় কোনো কালো ধোঁয়া বা স্যুট তৈরি হয় না।
তবে এলপিজি তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে প্রচার পেলেও এটি মূলত ফসিল ফুয়েলনির্ভর। প্রোপেন ও বিউটেন আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেলের প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে। ফলে এর ব্যবহার বাড়লে কার্বন নিঃসরণ পুরোপুরি কমে না, বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক এলাকায় এখনো প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ রান্নার জন্য কাঠ বা কয়লা ব্যবহার করে। এতে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। তাই এলপিজি ব্যবহার বাড়লে অবকাঠামো ও জলবায়ু দুয়েরই উন্নতি হতে পারে বলে অনেক গবেষক দাবি করেন।
বিশ্লেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, বড় পরিসরে মানুষ এলপিজিতে রান্না শুরু করলে প্রতি বছর ১০ কোটির বেশি টন ক্ষতিকর ব্ল্যাক কার্বন কমানো সম্ভব। এই পরিমাণ কমানো মানে একটি বড় শিল্পোন্নত দেশের মোট কার্বন নির্গমন প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার সমান।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা কার্বন নির্গমন কমানোর নিয়ম কঠোর করছে। যেসব ব্যবসায়ীর আধুনিক জাহাজ আছে, তারা এতে সুবিধা পাচ্ছে। এর একটি উদাহরণ হলো বিগিএন কোম্পানির নতুন দ্বৈত জ্বালানি ভিএলজিসি ট্যাংকার। এই বড় জাহাজগুলো এখন এলএনজি জ্বালানিতে চলে।
এতে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে কার্বন ডাই-অক্সাইড কম বের হয়। ফলে কোম্পানির নিজস্ব নির্গমন বা স্কোপ–১ নির্গমনও কমে। ভবিষ্যতের কঠোর নিয়ম মেনে চলাও সহজ হয়। একই পথে এগোচ্ছে বিডব্লিউ এলপিজির মতো বড় প্রতিষ্ঠান। বিডব্লিউ এলপিজি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভিএলজিসি জাহাজের মালিক।
যেসব ব্যবসায়ীর জাহাজ কম কার্বন ছাড়ে এবং নিয়ম মেনে চলে, তারা যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া আফ্রিকা নতুন বাণিজ্যপথে প্রভাবশালী হচ্ছে। আর যাদের বহর পুরোনো, তারা কঠোর জলবায়ু নিয়মের কারণে বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিও এলপিজিকে শক্তিশালী করছে। ফলে দেশটির রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে। অনেক দেশ এখন কার্বন হিসাব রাখার নিয়ম চালু করছে। হাইড্রোজেন বা অফশোর বায়ুশক্তির মতো এলপিজি তত আকর্ষণীয় না হলেও এর গুরুত্ব বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো কোন জ্বালানি নেবে, সেই সিদ্ধান্তে এলপিজি বড় প্রভাব ফেলছে।

প্রতীকী ছবি
কূটনীতি
সবচেয়ে বড় কথা, যারা সংকটের সময়ও এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাদের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্পর্ক মজবুত হয়। এই মুহূর্তে সেই ভরসার জায়গা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর সঙ্গে যুক্ত আছে ব্যবসায়ীদের বড় নেটওয়ার্ক। তারা আমেরিকার এলপিজি এমন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শুধু বড় প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবসম্মত সমাধান কে দিতে পারে সেটাই আসল। এলপিজি সেই পরীক্ষায় সফল হয়েছে। এটি হয়তো জ্বালানি পরিবর্তনের শেষ গন্তব্য নয়। কিন্তু ভূরাজনীতি বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি।
এশিয়া ও আফ্রিকার বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম আমলেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সেই যুদ্ধ আরও কয়েকগুন বেড়ে যায়। দুই দেশের মধ্যে নতুন বাণিজ্য আলোচনা শুরুর আগেই চীন একটি প্রস্তাব দেয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপেনের ওপর ১২৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর কথা বলে।
এই শুল্ক এমন একটি পণ্যকে হুমকির মুখে ফেলে, যা চীনের শিল্পের জন্য খুব দরকারি। চীনের পেট্রোকেমিক্যাল খাতে প্রোপেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। শেষ পর্যন্ত শুল্ক প্রস্তাব কার্যকর হয়নি, কিন্তু বাজারে এর প্রভাব পড়ে। দামের ওঠানামা ও ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপেনের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। ওপিআইএস গ্লোবাল এলপিজি আউটলুকের তথ্য অনুযায়ী, চীন প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন প্রোপেন আমদানি করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অন্য অঞ্চল থেকে এই পরিমাণ সরবরাহ সহজে পাওয়া যায় না। জাহাজের রুট ও পণ্যের ধরনেও সীমাবদ্ধতা আছে। তাই এই নির্ভরতা বদলে ফেলা কঠিন।
গত ছয় বছরে এশিয়ার এলপিজি বাজার অনেক ধাক্কা খেয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধ, করোনার সংকট ও যুদ্ধজনিত সরবরাহ সমস্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। তবু এলপিজির চাহিদা কমেনি, বরং বেড়েছে।
২০১৮ সালের পর থেকে চীনের প্রোপেন আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২৪ সালে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৯৬ লাখ মেট্রিক টন। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও আমদানি বাড়িয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পের চাহিদা মেটাতেই তারা প্রোপেন ও বিউটেন বেশি কিনছে। এই দেশগুলোর মোট আমদানি ২০১৮ সালের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দামের ওঠানামা এশিয়ার বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে দেখা গেছে ওএমবিডি জাপান ও সিএফআর জাপান মূল্যের পার্থক্য। ওএমবিডি জাপান হলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রোপেনের ব্যয়ভিত্তিক মূল্য। দুইবার এই মূল্য সিএফআর জাপানের চেয়ে বেশি হয়েছে। প্রথমবার ফেব্রুয়ারিতে এবং আবার এপ্রিলের শুরুতে।
কিছু সূত্র বলছে, জাহাজ চলাচলের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। উত্তর সাগর থেকে কিছু কার্গো জুন মাসে এশিয়ার দিকে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন রুট খুব কম দেখা গেছে। তথ্যগুলো এখনো নিশ্চিত নয়। তবু এতে বোঝা যায়, ক্রেতারা নতুন কৌশল ভাবছে।
চীন পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহের ওপর ভরসা করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ রপ্তানি প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণ। এই মিশ্রণ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বেশি উপযোগী। চীন হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি বাড়ালে আঞ্চলিক বাজারে সমস্যা তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত বিউটেন বিক্রি করা কঠিন হতে পারে। আবার যেসব দেশ এই মিশ্র কার্গোর ওপর নির্ভর করে, তাদের সরবরাহেও ধাক্কা লাগার শঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপেনের ওপর বেশি শুল্ক বসানোর সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। আপাতত এই শুল্ক স্থগিত আছে, কিন্তু ঝুঁকি থেকেই গেছে। এতে এশিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলোর দুর্বল অবস্থা স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কারখানায় প্রোপেন ডিহাইড্রোজেনেশন বা পিডিএইচ ইউনিট আছে, তারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
ওপিআইএসের কেমিক্যাল মার্কেট অ্যানালিটিকসের হিসাব অনুসারে, শুল্ক কার্যকর হলে চীনের পিডিএইচ সক্ষমতার ৪০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল সংকটে পড়তে পারে। এর ফলে প্রোপিলিন উৎপাদনে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
২০২৫ সালের মার্চের শেষে চীনে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন পিডিএইচ সক্ষমতা ছিল। দেশের মোট প্রোপিলিন উৎপাদনের ৩০ শতাংশের বেশি আসে এই ইউনিটগুলো থেকে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে এসব ইউনিট গড়ে ৭০ শতাংশ হারে চলেছে। তাই প্রোপেন সরবরাহে সমস্যা হলে দেশের ভেতরের বাজারে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
ন্যাফথা ক্র্যাকার কিছুটা সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ বেশি নেই। সিএমএর হিসাব বলছে, ন্যাফথা থেকে বাড়তি প্রোপিলিন সর্বোচ্চ চার লাখ মেট্রিক টন পাওয়া যেতে পারে। আঞ্চলিক উৎপাদকদের কাছ থেকে আমদানি বাড়িয়েও কিছু ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
এলপিজি ও পেট্রলের পরের হালকা অংশটাই মূলত ন্যাফথা। এটি সাধারণত ৩০–২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে সংগ্রহ করা হয়। ন্যাফথা ক্র্যাকার হলো পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানা বা প্রক্রিয়া।
স্টিম ক্র্যাকারগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয়। এগুলো বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারে। তাই খরচ বা সরবরাহে ধাক্কা এলে এগুলো কিছুটা সুবিধা পায়। প্রোপিলিন কম পাওয়া গেলেও ন্যাফথা একটি বিকল্প হিসেবে থেকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক গ্যাস সস্তা হওয়ায় ইথেনও প্রতিযোগিতায় টিকে আছে।
উৎপাদকরা ভবিষ্যতে কীভাবে মানিয়ে নেবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। কাঁচামাল ব্যবস্থাপনার কৌশল ও নমনীয়তা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এশিয়ার এলপিজি বাজার এখন নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রতি খুব সংবেদনশীল। এমনকি স্থগিত একটি শুল্ক প্রস্তাবও দামে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এনেছে। কার্গো চলাচলের পথও বদলানোর ইঙ্গিত দেখা গেছে।
আফ্রিকায় এখনো ৯০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ পরিচ্ছন্ন রান্নার সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য মতে, ২০৪০ সালের মধ্যে সবার জন্য পরিচ্ছন্ন রান্নার সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। সেখানে নতুন গৃহস্থালি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই পূরণ করবে এলপিজি।
জিম্বাবুয়ে এলপিজি ব্যবহারের হার ৩৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে এবং বাণিজ্যে উৎসাহ দিতে এলপিজির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করেছে।
অ্যাঙ্গোলা ২০২৭ সালের মধ্যে এলপিজির চাহিদা ৩১ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করছে এবং সরবরাহ শক্তিশালী করতে তাদের অ্যাঙ্গোলা এলএনজি প্ল্যান্টে ফিডস্টক বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিয়ানলং এলপিজি সিলিন্ডার ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট উদ্বোধন করেছে এবং একটি বড় এলপিজি রেল পরিবহন প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। এর কার্যক্রম শুরু হবে ২০২৮ সালে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বিশ্লেষণ বলছে, এলপিজির প্রসার স্বল্পমেয়াদে বায়ুদূষণ কমালেও ২০৩০ পরবর্তী সময়ে জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদ্যুতায়ন, হিট-পাম্পভিত্তিক কুকিং ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ছাড়া টেকসই বিকল্প থাকবে না। অর্থাৎ এলপিজি একটি ট্রানজিশনাল ফুয়েল, চূড়ান্ত সমাধান নয়।













