সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্তকে দেশের পোশাকশিল্পের জন্য চরম ‘বিপর্যয়কর’ ও ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়েছে পোশাকখাতের শীর্ষ দুই সংগঠন—বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)। অবিলম্বে এই একতরফা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
সোমবার রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পোশাকখাতের নেতারা বলেন, বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির এই সংকটময় সময়ে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ মানে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে সচেতনভাবে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) অভিযোগ, ভারত সরকারের প্রণোদনায় সেই দেশের সুতা ব্যবসায়ীরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করছে এবং এর ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো অস্তিত্বসংকটের মুখে পড়েছে। দেশীয় সুতার চাহিদা কমে যাওয়ায় খাতটির উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। ইতিমধ্যে ৫০টি বৃহৎ শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিটিএমএ এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড টারিফ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাস্টমস টারিফের আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বিদ্যমান কড়াকড়ি বা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের পক্ষে মত দিয়েছে। বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার হলে ভারতীয় সুতায় শুল্ক বসবে এবং তা তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সংস্থা দুটির আশঙ্কা, এতে রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ অবদান রাখা পোশাকখাতের প্রতিযোগতাসক্ষমতা কমিয়ে দেবে, যা খাতটিতে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশপত্রে জানিয়েছে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ভারতীয় সুতার আমদানি বেড়েছে ১৫৭ শতাংশ।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান। তিনি বলেন, “বিশ্ববাজারের মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের অর্থ হলো দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে জেনেশুনে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।”
অনুষ্ঠানে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “পোশাকখাত এখন আইসিইউতে। পাটের পর এবার পোশাকশিল্প ধ্বংসের পথে যাচ্ছে।”
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিমালা অনুযায়ী আমদানিতে শুল্কারোপের আগে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এমন প্রমাণ উপস্থাপন বাধ্যতামূলক। অথচ সুতা আমদানির ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, যা সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সেফগার্ড চুক্তির লঙ্ঘন।
পোশাক রপ্তানিকারকরা অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বর্তমানে প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকা বেশি দাম দাবি করছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় রপ্তানি পোশাকের প্রতিযোগতাসক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, দেশের নিট পোশাকখাত থেকে বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়। কিন্তু উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত সুতা দেশীয় মিলগুলো সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় আমদানির পথ বন্ধ হলে উৎপাদন শিডিউল ভেঙে পড়বে এবং রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, তাঁরা দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিরোধী নন। তবে সেই সুরক্ষা আমদানিতে বাধা দিয়ে নয়, বরং সরাসরি নগদ সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মাধ্যমেই নীতিগত সহায়তা দেওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, ফয়সাল সামাদ, মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সুমাইয়া ইসলাম, কাজী মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ সোহেল, সাবেক সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং বিজিএমইএর জনসংযোগ ও প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদ কবিরসহ অন্যান্য নেতা।
শেষে সংগঠন দুটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি আয় এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষার স্বার্থে সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানায়।













