ড. মুহম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির এক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাস্তি প্রত্যাহার করলেও তা গোপন রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “সাধারণত রিভিউ বা রিভিশন গ্রহণের নজির কমিশনের ইতিহাসে খুব একটা নেই। হয়তো দু-একটা হতে পারে। এজন্য এটি প্রকাশ করা কিংবা ওয়েবসাইটে দেওয়ার রেওয়াজও ছিল না। তবে এখন থেকে রিভিউতে এরকম উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসে, তাহলে তা প্রকাশ করা হবে।”
বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল মুহম্মদ ইউনূসের কোম্পানি গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের এমডি চৌধুরী খালেদ সাইফুল্লাহকে এক কোটি টাকা জরিমানা ও তিন বছরের জন্য পুঁজিবাজারে নিষিদ্ধ করেছিল বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের কমিশন। এরপরই গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট থেকে খালেদ সাইফুল্লাহকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যিনি একই সঙ্গে ন্যাশনাল ক্রেডিট রেটিং লিমিটেডের (এনসিআরএল) পরিচালক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।
তবে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নতুন কমিশন খালেদ সাইফুল্লাহর শাস্তি পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করে তাকে সব ধরনের শাস্তি ও জরিমানা থেকে অব্যাহতি দেয়। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জরিমানা ও শাস্তি প্রত্যাহারের এমন সিদ্ধান্ত কমিশন নিলেও তা প্রকাশ করেনি। জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে বিএসইসি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলেও অব্যাহতির তথ্য দেয়নি কমিশন।
বিভিন্ন অনিয়ম ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৩ সালের ১ মার্চ মার্চেন্ট ব্যাংক গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও এর এমডি চৌধুরী খালেদ সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসি। এরপর ১৬ এপ্রিল কমিটি একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল করে কমিশনে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চৌধুরী খালেদ সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কমিশন। একই সঙ্গে গ্রামীণ ক্যাপিটালের পরিচালনা পর্ষদকেও সতর্ক করে বিএসইসি।
বিএসইসির ইতিহাসে বর্তমান কমিশন দেড় বছরেরও কম সময়ে সবচেয়ে বেশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যাতে হাজার হাজার কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার চেয়ে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন জানালেও বর্তমান কমিশন তা গ্রহণ করেনি। এক্ষেত্রে গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সাবেক এমডি চৌধুরী খালেদ সাইফুল্লাহ একমাত্র উদাহরণ, যার রিভিউ আবেদন গ্রহণ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে বর্তমান কমিশন।
বিএসইসির তদন্তে দেখা যায়, গ্রামীণ ক্যাপিটাল ৮২২ জন গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ৯৬.৭৫ কোটি টাকা নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব নিজস্ব উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা, অননুমোদিত ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী খালেদ সাইফুল্লাহর স্বার্থের সংঘাত।
চৌধুরী খালেদ সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে গুরুতর যেসব অভিযোগ কমিশনের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গ্রামীণ ক্যাপিটালের এমডি পদে অনুমোদন নেওয়ার সময় খালেদ সাইফুল্লাহ নিজের গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য কমিশনকে জানাননি। তিনি অনুমোদন গ্রহণের সময় ন্যাশনাল ক্রেডিট রেটিং লিমিটেডের (এনসিআরএল) পরিচালক হিসেবে তার অবস্থান গোপন করেন। অথচ এনসিআরএলের পরিচালক হওয়া অবস্থায় তিনি কোনো মার্চেন্ট ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব পালন করলে তা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে।
তথ্য গোপন করার বিষয়টি সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬–এর ৩৫(১)(খ) বিধি এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর ধারা ১৮–এর স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করে তৎকালীন কমিশন। সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী, মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ পেতে হলে প্রার্থীকে তার সকল সম্পর্ক, সংযুক্তি এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত স্পষ্টভাবে জানাতে হয়।
বিএসইসির পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, এনসিআরএল এইচ.আর. টেক্সটাইল লিমিটেডের বন্ড অনুমোদনের জন্য ক্রেডিট রেটিং প্রদান করেছে। এর কিছুদিন পর গ্রামীণ ক্যাপিটালের বোর্ডে ওই প্রতিষ্ঠানের বন্ডে বিনিয়োগের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। বিএসইসি মনে করছে, এনসিআরএলের পরিচালক হিসেবে খালেদ সাইফুল্লাহর ভূমিকা এবং গ্রামীণ ক্যাপিটালের এমডি হিসেবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বিষয়টি ‘স্বার্থের সংঘাত’। একদিকে তিনি একটি কোম্পানির রেটিং অনুমোদনে জড়িত, অন্যদিকে সেই কোম্পানির বন্ডে গ্রামীণ ক্যাপিটালের বিনিয়োগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন—এটি পেশাগত দায়িত্বহীনতা ও স্বার্থের সংঘাতের পরিষ্কার উদাহরণ। এটি মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার বিধিমালা, ১৯৯৬ এর ৩৫(১)(খ) বিধির আরও একটি লঙ্ঘন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
গ্রামীণ ক্যাপিটাল কর্তৃক জমা দেওয়া নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে ৮২২ জন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত নিট ৯৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সঠিক ও ন্যায্য চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। বড় সংখ্যক ক্লায়েন্টের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পরিচালনা করা সত্ত্বেও, কর্তৃপক্ষের দ্বারা অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠিত বিনিয়োগ নীতি/স্কিম/গাইডলাইন ছিল না।
বিএসইসির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্রামীণ ক্যাপিটাল চারটি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছে, যা গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে নিজস্ব উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে গ্রাহকদের নগদ প্রাপ্তি এবং প্রদানের কোনো প্রতিফলন ছিল না। এছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকটি গত পাঁচ বছরের আর্থিক বিবরণীতে প্রদর্শিত শেয়ার বিক্রি থেকে মূলধন লাভের হিসাব দেখাতেও ব্যর্থ হয়েছে।
মুনাফায় শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব (ডব্লিউপিপিএফ) সংক্রান্ত বিএসইসির নিয়ামাবলি বিষয়ে পরিদর্শকদের কাছে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেছেন গ্রামীণ ক্যাপিটালের এমডি। এছাড়া তিনি ৮৭তম এবং ৮৮তম পর্ষদ সভার নির্দেশনার সঙ্গে সংগতি রেখে পোর্টফোলিও সংক্রান্ত সকল তথ্য ও সারসংক্ষেপসহ প্রতিবেদন উপস্থাপনে ব্যর্থ হন—বিএসইসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিএসইসির পরিদর্শন চলাকালীন, গ্রামীণ ক্যাপিটাল এবং এর এমডি খালেদ সাইফুল্লাহ পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য, এবং ব্যাখ্যা প্রদানে বা সহযোগিতায় ব্যর্থ হন।
এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তা কমিয়ে দেওয়া কিংবা প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন। আবার কমিশন যদি মনে করে, আগের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঠিক হয়নি, সেক্ষেত্রে কমিশন নিজেও ‘অন মোশনে’ তা রিভিউ করতে পারে। এখন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির রিভিউয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে বর্তমান কমিশন মনে করেছে যে, তার বিরুদ্ধে নেওয়া আগের কমিশনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঠিক হয়নি। তাই ওই শাস্তি প্রত্যাহার করা হয়েছে।”













