পর্যুদস্ত শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ১১ শিল্পগোষ্ঠী

ছবি: ডিএসজে কোলাজ
ছবি: ডিএসজে কোলাজ

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ ও শেয়ার জব্দের পরিমাণ ও সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে যার আর্থিক মূল্য ৬৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডিএসজে প্রতিবেদকের হাতে আসা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে জব্দকৃত সম্পদের মূল্য ছিল ৫৭ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা।

আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক হিসাব, শেয়ারবাজারের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব, দেশ–বিদেশে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ।

শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ এই ১১ শিল্পগোষ্ঠী হলো—এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ ও প্রিমিয়ার গ্রুপ।

শুরুতে এই তালিকায় এইচবিএম ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপ না থাকলেও পরে যুক্ত করা হয়েছে। এসব গ্রুপের পাশাপাশি গ্রুপপ্রধান ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন।

এর মধ্যে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি ব্যাংক দখল করে লুটপাট ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং শেয়ারবাজার থেকে বিপুল অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

আরামিট গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লুট করে বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

বাকি সব গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লোপাটের পাশাপাশি ঘুষ, কর ফাঁকি, অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এই বিষয়টিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

ইতোমধ্যে, জোরেশোরে কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যৌথ তদন্ত দল। সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ ডিসেম্বর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভা শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে দেশে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিসহ মোট ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

হাসিনার ঘনিষ্ঠ এসব শিল্পগোষ্ঠীর সম্পদ জব্দ এবং বিচারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ডিএসজেকে বলেন, “একটা বার্তা যাবে যে, জাল–জালিয়াতি করে পার পাওয়া যায় না। প্রভাবশালী হলে যে আপনাকে ধরাছোঁয়া যাবে না, তা এই জব্দের ঘটনায় অন্তত ভুল প্রমাণিত হয়েছে।”

“এসব সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। তবে এই বার্তায় তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করছে, এই উদ্যোগগুলো শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়! শেষে যদি দেখা যায়, এগুলোর কিছুই হয়নি বা ঝুলে আছে কিংবা দুই–চার বছর পরে তাঁরা সম্পদগুলো ফিরে পেয়েছেন, তাহলে এই বার্তা কোনো কাজ করবে না।”

“তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা একটি বার্তা পেয়েছেন—ক্ষমতাচ্যুত হলে খবর আছে! তা–ও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কেউ কেউ বেকায়দায় পড়লেও সবাই তো আর বেকায়দায় পড়েননি,” উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “যেহেতু এসব বিষয় বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হতে হবে কিন্তু বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ।”

ডিএসজে প্রতিবেদকের হাতে থাকা বিএফআইইউয়ের নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১টি গ্রুপের এক হাজার ৫৭৩টি ব্যাংক হিসাবে এক হাজার ৭১৫ কোটি টাকা জমা আছে, যা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তাদের নামে শেয়ারবাজারে বিও হিসাবে ১৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা অবরুদ্ধ অবস্থায় জমা রয়েছে। ফলে, মোট ১৬ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা অবরুদ্ধ হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে কার্যকর করা হয়।

এ ছাড়া দেশে তাদের স্থাবর সম্পদ ৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৩৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে জব্দ করা হয়েছে, ৬ হাজার ৯৭ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ ও ৪ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ। সব মিলিয়ে জব্দ করা হয়েছে, ৫৭ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ।

বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের লক্ষ্যে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১০৪টি মামলা হয়েছে। ১৪টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছেন তদন্তকারীরা এবং চারটিতে রায় দিয়েছেন আদালত।

বাকি মামলাগুলো স্বল্প সময়ে নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচারের আওতায় আনা যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ হোসেন ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করা কঠিন। শেষ কথা তো আদালতই বলবে। তবে ইস্যুটা হলো—আইনের ভেতরে থেকে এগুলোকে ‘ফাস্ট ট্র্যাকে’ ফেলা যায় কি না। সেটাও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই করতে হবে। তবে আমার মনে হয় না, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তা করতে পারবে। নির্বাচিত সরকার এসে সংসদের মাধ্যমে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করতে চাইলে তাতে কোনো বাধা নেই।”

“তবে রাজনীতিবিদরা সেটা করবেন কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়। কারণ, তাঁরা যদি মনে করেন, নিজেদের খোঁড়া গর্তে তাঁদেরই পড়তে হতে পারে, সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার উদাহরণ রয়েছে। নিজের তৈরি করা আইসিটিতে (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) এখন তারই বিচার হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।

অনিয়মে এগিয়ে এস আলম

তদন্ত সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রুপটি ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, এসআইবিএল, গ্লোবাল, ইউনিয়ন, জনতা, এক্সিমসহ ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে–বেনামে ঋণের মাধ্যমে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি সরিয়েছে। এর মধ্যে অনেক ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে চলে গেছে।

এখন পর্যন্ত ছয়টি দেশে এস আলম গ্রুপের একাধিক তারকা হোটেল, জমি ও সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। ফলে, গ্রুপটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিদেশে থাকা সম্পদ তারা বিক্রির চেষ্টাও করছেন বলেও গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন।

সর্বশেষ, ১৭ ডিসেম্বর সচিবালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের কাছে সুস্পষ্ট ও পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে যে, তিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক। এটি বাংলাদেশের আদালতেও প্রমাণিত হয়েছে।”

তাঁর দাবি, “এস আলম একটি বাংলাদেশি ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছাড়া সম্ভব নয়।”

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এস আলমের শুরু করা সালিশি কার্যক্রম সম্পর্কে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এ পদক্ষেপ ভিত্তিহীন এবং বাংলাদেশ জোরালোভাবে এই মামলা মোকাবিলা করবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি এস আলমের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকেও নজর দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল হলেও পাচারকৃত অর্থের উৎস চিহ্নিতকরণ এবং আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে দাবি করে গভর্নর বলেন, “বিদেশ থেকে টাকা ফিরিয়ে আনতে সাধারণত ন্যূনতম চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার বাস্তবতা এটাই। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মামলা দায়ের করা হয়েছে। অবিলম্বে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব না হলেও কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।”

সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতায় লন্ডনের একটি মামলার কথা উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, “সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মামলাটি চ্যালেঞ্জ করেননি এবং ইতোমধ্যে হেরে গেছেন। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের দাবি করা অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশ ফিরে পেতে পারে এবং তা ফেব্রুয়ারির আগে অথবা বছরের শেষের দিকে হতে পারে।”

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবার এবং আরামিট গ্রুপের নামে থাকা দেশ–বিদেশের ৫৮০টি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমিসহ স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে নয়টি বাড়ি রয়েছে। বেসরকারি খাতের ইউসিবি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল সাইফুজ্জামান চৌধুরী পরিবারের হাতে। তাঁর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরীর একাধিক সম্পদের খোঁজ মিলেছে। ইতোমধ্যে লন্ডনে একটি ভবন বিক্রিও করেছেন তিনি।

সালমানের বেক্সিমকো ও অন্যান্য

অনুসন্ধানে প্রকাশ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মোট ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থ পাচার করে লন্ডন ও সিঙ্গাপুরে গ্রুপটির পরিবারের নামে সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো।

সালমান বাংলাদেশের একজন প্রভাবশালী শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালের পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি মামলার এই আসামি দীর্ঘদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংসদ সদস্যকে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়। ঋণের নামে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, হত্যাসহ একাধিক মামলায় জেলে রয়েছেন তিনি।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ২০২৩ সালে করা একটি প্রতারণার ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানকে ১০০ কোটি ও তার ছেলে আহমেদ শায়ান এফ রহমানকে ৫০ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার পাশাপাশি তাদের দুজনকে পুঁজিবাজারে আজীবন অবাঞ্ছিত (পারসোনা নন গ্রাটা) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিএসইসি)।

বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থাকার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে কিছু ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গ্রুপটির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জমি বরাদ্দে অনিয়ম, ভূমি জবরদখল ও ব্যাংকঋণ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের আবেদনে এরই মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ তাঁর পরিবারের আট সদস্যের বিদেশে থাকা স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, স্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে বসুন্ধরা পরিবারের সদস্যদের সম্পদের খোঁজ মিলেছে। এ জন্য সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

সিকদার গ্রুপ নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি সরিয়ে নিয়েছে। সিকদার গ্রুপের রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদারের বিরুদ্ধে জাল কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকঋণ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার ছাড়াও নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

সিকদার পরিবারের সম্পদ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউ ইয়র্ক, প্রমোদনগরী হিসেবেখ্যাত লাস ভেগাস, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবী ও থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে রয়েছে, সিকদার পরিবারের একাধিক কোম্পানি।

ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিমের ৩১টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ ও একটি ফ্ল্যাটসহ ৪৩ একর জমি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার, ঋণখেলাপি, কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। তাঁদের নামে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশে সম্পদের খোঁজ মিলেছে।

নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে নেওয়া ঋণ নাসা গ্রুপের হিসাবে স্থানান্তর, ৭৮১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ছাড়াও ব্যাংকঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নজরুল ইসলাম মজুমদারের যুক্তরাজ্যে পাঁচটি বাড়ি, আইল অব ম্যান-এ একটি এবং জার্সিতে একটি বাড়ির খোঁজ মিলেছে। এসব সম্পদ অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

নাবিল গ্রুপ নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সরিয়েছে। চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম ও তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে শেল কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ নেওয়া, ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাৎ, অর্থ পাচার, সরকারি জমি দখল এবং শেয়ারবাজারে কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সামিট গ্রুপের কর্ণধার আজিজ খানের বিরুদ্ধে দেশীয় কোম্পানির মালিকানা বিদেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবসায় অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আজিজ খানসহ তার পরিবারের ১১ সদস্যের ১৯১টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিপুল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো।

দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে ১৪ ডিসেম্বর কমিশনের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, তাদের অনুসন্ধানে মোহাম্মদ আজিজ খানের নামে মোট ৩৩০ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ১০৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া জেমকন গ্রুপের বেশ কিছু অনিয়মের খোঁজ পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই গ্রুপের মালিক এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের বিরুদ্ধেও এ বছরের ১৮ আগস্ট মামলা করেছে দুদক। তার বিরুদ্ধে সাত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৪৫টি ব্যাংক হিসাবে ১০৯ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

জেমকন বাদ, নজরে প্রিমিয়ার

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শুরুতে ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক অনিয়ম ধরতে যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছিল। পরে সেই শিল্পগোষ্ঠীর তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়।

অনিয়ম বিবেচনায় তালিকা থেকে কাজী নাবিল আহমেদের জেমকন গ্রুপকে বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়, আওয়ামী লীগের আরেক সাবেক সংসদ সদস্য এইচবিএম ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপকে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন নাগরিক বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার খরচ করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকে বছরে গড়ে ২ লাখ ১৬ হাজার ডলার করে ব্যয় করেছেন। সব মিলিয়ে তিন বছরে ২২টি কার্ড দিয়ে ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডলার খরচ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশে ব্যয়ের দায় বাংলাদেশ থেকেই পরিশোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তদন্তে এসব অনিয়ম ধরা পড়ার পর প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর টানা চেয়ারম্যান ছিলেন এইচবিএম ইকবাল। রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। ব্যাংকটিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দুদকের একটি সূত্র জানায়, এইচবিএম ইকবালসহ পরিবারের কয়েকজন দুবাইয়ে থাকেন। পরিবারের দুই সদস্য থাকেন মালয়েশিয়ায়। দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহতে অর্ধশতাধিক সম্পদের সঙ্গে ইকবাল পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে।

ব্যাংকটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মইন ইকবালের আরএফসিডি হিসাবে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ‘সাবলাইম গ্রিনটেক্স লিমিটেড’-এর ইআরকিউ হিসাব থেকে ৫০ হাজার ডলার স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থ মইন ইকবালের ক্রেডিট কার্ডের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ২০৫ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি রয়েছে। এসব কারণে এইচবিএম ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপের বিরুদ্ধে তদন্ত এখন অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

ইচ্ছা থাকলেই কি উপায় হয়?

বিদেশের মাটিতে আইনি লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “সম্পদ উদ্ধার একটি দীর্ঘপথ। তবে আমরা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রত্যাশা- টেকসই আইনি প্রচেষ্টা অবশেষে ফল বয়ে আনবে।”

আন্তর্জাতিক মামলাগুলোতে আপিলের সুযোগ উদ্ধার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “এগুলো আইনি প্রক্রিয়া, এখানে কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই।”

বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তবে আমাদের যে পরিস্থিতি, তাতে সব সময় এই উপায় থাকে না। কারণ, উপায় বের করার সক্ষমতা থাকতে হয়। ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য যে শক্তিগুলো দরকার—অর্থাৎ আমলাতান্ত্রিক শক্তি, আইনি শক্তি ও ব্যবসায়ীদের সমর্থন—সেগুলো আছে কি না, সেটাই প্রশ্ন।”

তিনি বলেন, “এই যে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো আছে, তাদের সঙ্গে না নিয়ে আপনি ট্রাইব্যুনাল করতে পারবেন না। খুব বেশি ব্যবসায়ীকে শাস্তি দেওয়ার নজিরও নেই। তাই, ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’—এই প্রবাদ বাক্যটি আমাদের ক্ষেত্রে সম্পাদনার প্রয়োজন আছে।”

উল্লিখিত অভিযুক্তদের মধ্যে সবচেয়ে সরব সামিট গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে তাদের নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে।

গ্রুপের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিঙ্গাপুর থেকে আজিজ খানের দেওয়া একটি অনলাইন ভাষণও নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে চ্যানেলে প্রকাশ করেছে গ্রুপের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার।

সেখানে তিনি বলেন, “আমরা সিঙ্গাপুরে কোম্পানি খুলেছি ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে, যার পরিমাণ ১৭৫ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এটা আমাদের অন্যতম ‘সোর্স অব ইনকাম’। এটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে কেন? আমাদের তো লোন দিয়েছে আইএফসি। বরং বাংলাদেশে আমরা ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছি বিদেশ থেকে এনে। যেটা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ।”

“আমরা তো বিদেশ থেকে বিনিয়োগ করছি। বাংলাদেশ ব্যাংক বা কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি,” দাবি করে তিনি আরো বলেছিলেন, “বিদেশি ব্যাংকগুলো আমাদের এফিসিয়েন্সি দেখে বিনিয়োগ করেছে। তারা আমাদের বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোতে গিয়ে দেখেছে, সেগুলো সেরা পাওয়ার প্ল্যান্ট। অথচ লোকজন বলে, আমরা বাংলাদেশ থেকে টাকা নিয়ে গেছি। আমরা কখনো কোনো বেআইনি কাজ করিনি। আমাদের সমস্ত টাকাই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা আছে।”

আরেক অভিযুক্ত সাইফুজ্জামান চৌধুরী একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তার সব বিদেশি সম্পদ বৈধ ব্যবসা থেকে অর্জিত এবং তার বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ষড়যন্ত্র চলছে।

চলতি বছরের মে মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, জব্দকৃত টাকা ও সম্পদ আইনগত প্রক্রিয়া দিয়ে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে এবং এগুলো ব্যাংক ও জনসাধারণের জন্য কাজে লাগানো হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top