আমদানি ব্যয়ের বিশাল চাপের মুখে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সই এখন দেশের অর্থনীতির প্রধান রক্ষাকবচ। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী সংকট ও তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় বাড়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যা মোকাবিলায় প্রবাসীদের আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯১৭ কোটি ৩ লাখ ডলার। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন বা ২২৫ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় অনেক বেশি হওয়ার কারণেই এই বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা পাঁচ মাস ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর রেকর্ড গড়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসে ৩১৩ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৮ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বড় হলেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বদৌলতে দেশের চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ভারসাম্যে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে চলতি হিসাবে ১০০ কোটি ডলারের ঘাটতি থাকলেও নয় মাস শেষে তা কমে ৩৯ কোটি ৭ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে ৬১ কোটি ডলার। পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহের কারণেই এই হিসাবের উন্নতি সম্ভব হয়েছে।
চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি কমে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। সহজ কথায়, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট হলো দেশের দৈনন্দিন আয়ের খাতা, যেখানে বিদেশ থেকে আসা আয় এবং বিদেশ যাওয়া ব্যয়ের হিসাব থাকে। এই ঘাটতি কমার অর্থ হলো আমাদের দৈনন্দিন আয়ের তুলনায় ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছে বা রেমিট্যান্সের মতো উৎসগুলো থেকে আয় বাড়ছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর থেকে তাৎক্ষণিক চাপ কমিয়ে দেয় এবং টাকার মানকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার দুই প্রধান উৎস রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। এই সময়ে দেশে মোট ২,৯৩৩ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ২,৪৫৪ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ১৯.৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ৩,৯৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২.০২ শতাংশ কম। প্রবাসীদের পাঠানো শক্তিশালী প্রবাহ রপ্তানি ও আমদানির ঘাটতি সামাল দিয়ে রিজার্ভ এবং ডলার বাজারের অস্থিরতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
আর্থিক হিসাবে অবশ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আর্থিক হিসাবে ৪০৮ কোটি ৩ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত থাকলেও মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮১ কোটি ২ লাখ ডলারে। তবে স্বস্তির খবর মিলেছে ট্রেড ক্রেডিটের ক্ষেত্রে। পণ্য গ্রহণ করে পরে মূল্য পরিশোধের এই বিশেষ সুবিধায় জুলাই-মার্চ সময়ে ৩২৩ কোটি ৫ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, যা আগের মাসের ২৫৬ কোটি ২ লাখ ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
সামগ্রিকভাবে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সার্বিক ভারসাম্যে উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ৯ লাখ ডলারে, যা আট মাস শেষে ছিল ৩৪২ কোটি ৭ লাখ ডলার। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি এখনো কাটেনি। ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ এবং জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে আমদানি ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতি রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম আরও বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো কঠিন হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।













