‘রাস্তার আন্দোলনে সিদ্ধান্ত বদলাবে না’; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হুঁশিয়ারি

Web Photo Card June 1 2026 IB
ছবি: ডিএসজে

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের বাইরে চলমান গ্রাহক বিক্ষোভ ও পর্ষদ সভা বয়কটের চেষ্টার মুখে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, রাস্তায় কোনো আন্দোলন বা চাপ তৈরি করে রেগুলেটরের কোনো নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যাবে না। সোমবার দিলকুশায় ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনার পর এই কড়া হুঁশিয়ারি আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে বড় হতে থাকলে তা ওই প্রতিষ্ঠানের টেকসই হওয়ার জন্য বড় হুমকি। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের বাইরের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠনের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হচ্ছে কি না। কোনো ব্যাংকই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না এবং রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

মুখপাত্র আরও জানান, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিক্ষোভ বা মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য যা উপযুক্ত এবং আইনগতভাবে সিদ্ধ, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভা সরাসরি না করে ভার্চ্যুয়ালি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংক কম্পাউন্ডের ভেতরের নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষভাবে আমলে নিচ্ছে।

গভর্নরের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মুখপাত্র বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। গভর্নর ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, কাজ করতে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হলে তা যেন সরাসরি জানানো হয়। কর্মকর্তারা সেই চাপ মোকাবিলা করতে না পারলে গভর্নর নিজে আইনগতভাবে তা মোকাবিলা করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন শক্ত অবস্থানের বিপরীতে সোমবার সকাল থেকেই ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে দিলকুশায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে শত শত গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার বিক্ষোভ করতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে অভিযান শুরু করে। পুলিশের এই ব্যাপক বলপ্রয়োগের ফলে সচেতন গ্রাহক ফোরামের শতাধিক সদস্য আহত হলে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচির পেছনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারী খাতের এই ব্যাংকটি এক সময় পুরোপুরি জামায়াতপন্থী লোকজনের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সামরিক ও গোয়েন্দা চাপ প্রয়োগ করে ব্যাংকটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেয়। এরপর এস আলমের বিরুদ্ধে ব্যাংকটি থেকে নামসর্বস্ব কোম্পানির নামে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ ওঠে, যা দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নূর নবী মানিক অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ বর্বরভাবে বলপ্রয়োগ করেছে। নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম মূলত ব্যাংক লুটেরা এস আলমের দোসর এবং তাকে নিয়োগ দেওয়ার অর্থ হলো ব্যাংকে আবার চুরির ব্যবস্থা করা। এস আলমের তল্পিবাহক এই চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে বহালের দাবি জানান তিনি।

দিলকুশা কার্যালয়ের ভেতরেও চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন বিক্ষোভকারীরা ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসেনের কক্ষে ডিবির বৈঠক চলাকালে ঢুকে পড়েন। এর আগে এমডিকে চাপ দিয়ে অনলাইনে গোপন পর্ষদ বৈঠকের আয়োজন করার অভিযোগে তার রুমের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। ভারপ্রাপ্ত এমডি জানান, পর্ষদ বৈঠকের অনুমোদন থাকলেও গ্রাহকদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত তা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, বাণিজ্যিক এলাকার নিরাপত্তা ও যাতায়াত সচল রাখতে আন্দোলনকারীদের বারবার সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছিল। ভালোভাবে বুঝিয়ে বলার পরও তারা রাস্তা ছেড়ে না যাওয়ায় জনস্বার্থে পুলিশ বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে। সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে।

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের কাকরাইল শাখায় ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. হাফিজুর রহমান জানান, ২০-৩০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং শরীর থেকে অনেক রক্তপাত হয়েছে। অবস্থা বিবেচনায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (অবজারভেশন) রাখা হয়েছে।

আহতদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে আতিকুর রহমান, মিকাইল ইসলাম, রেজাউল করিম, ইকবাল হোসেন, হাবিবুর রহমান ও নূর মোহাম্মদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। আন্দোলনকারীরা ৫ দফা দাবি জানিয়ে বলেন, খুরশীদ আলমের অপসারণ ও যোগ্য নতুন গভর্নর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন থামাবেন না। দাবি আদায় না হলে আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

সাবেক চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান গত ২৪ মে পদত্যাগ করার পর সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। খুরশীদ আলম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পেলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তিনিসহ চারজন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান করায় শুরু থেকেই তীব্র বিরোধিতা করে আসছে গ্রাহকদের একটি পক্ষ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন স্পষ্ট করে দিল যে, কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা রাস্তার আন্দোলন দ্বারা তারা প্রভাবিত হবে না।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top