মাথাপিছু আয় ৩০০০ ডলার ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ওপরে

DSJ Web Photo June 10 2026 MacroStabilityBD
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘হাফ ট্রিলিয়ন ডলার’ বা ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মেগা মাইলফলক অতিক্রম করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অর্থনীতির এই রেকর্ড সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের নাগরিকদের গড় জীবনযাত্রার মান পরিমাপক মাথাপিছু জাতীয় আয়ও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর ভেঙে দিয়েছে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন (৫০,১০০ কোটি) ডলারে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। মূলত চড়া মূল্যস্ফীতির বাজারে কৃষি ও সেবা খাতের ধারাবাহিক ঘুরে দাঁড়ানোর ওপর ভর করেই পূর্ববর্তী অর্থবছরের শ্লথগতি কাটিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি এই ঐতিহাসিক অর্জন স্পর্শ করতে পেরেছে।

বিবিএস-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু জাতীয় আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলারে, যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত আয়ের (২,৭৬৯ ডলার) তুলনায় এক লাফে ২৫১ ডলার বা ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। দেশীয় মুদ্রা বা টাকার অঙ্কে এই মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

মাথাপিছু আয়ের এই নতুন উল্লম্ফন সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর কাতারে শামিল করেছে, যা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। নতুন এই প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩ হাজার ২০ ডলারের মাথাপিছু আয় নিয়ে বাংলাদেশ এখন ভারতের ($২,৯৪০), পাকিস্তানের ($১,৫৮০) এবং নেপালের ($১,৫০০) চেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।

তবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে মালদ্বীপ ($১৩,৯২০), শ্রীলঙ্কা ($৪,০২০) এবং ভুটানের ($৩,৭১০) চেয়ে এখনও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ, যা মূলত প্রবাসী আয় ও রেমিট্যান্সের আন্তর্জাতিক প্রবাহের ওপর নির্ভর করে।

বিবিএস-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৪.১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় বেশ সন্তোষজনক। দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট মূল্যের পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব যোগ করে এই মাথাপিছু জাতীয় আয় পরিগণনা করা হয়েছে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মাথাপিছু স্থূল দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিও বিদায়ী অর্থবছরের ২ হাজার ৬২৫ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৮৬৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এই ইতিবাচক গ্রাফকে স্বাগত জানালেও দেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি-গবেষকেরা উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে অন্ধভাবে না ছুটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে এখনো প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি লাগামহীন মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশ পার হওয়ায় সাধারণ ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চরমভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এই অবস্থায় উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগের মন্দা কাটিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে।

খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের কৃষি খাত ২.৪২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.৭৮ শতাংশ এবং সেবা খাত ৪.৩৫ শতাংশ থেকে ৪.৫৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ম্যানুফ্যাকচারিং বা শিল্প খাতের উৎপাদন ৩.৭১ শতাংশ থেকে কমে ২.৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির ঝুঁকি পরিহার করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে হবে এবং কঠোর সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top