বিদেশি ঋণ ছাড় ও নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমলেও পুরোনো ঋণ পরিশোধে একের পর এক রেকর্ড গড়ছে বাংলাদেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুদ-আসল মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সময়ে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে ১৪ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন বিদেশি অর্থের প্রবাহ কমার বিপরীতে ঋণের কিস্তির চাপ দ্রুত বাড়তে থাকায় অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। একই সময়ে বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ও কমে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ৫২৪ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৮৩২ কোটি ডলার থেকে ৩০৮ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৭ শতাংশ কম। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বিদেশি ঋণ প্রতিশ্রুতি।
একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে দাঁড়িয়েছে ৮০৭ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৮৫৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে অর্থছাড় কমেছে ৪৯ কোটি ডলার। এটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ ছাড়।
অন্যদিকে ঋণ পরিশোধে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। বিদায়ী অর্থবছরে সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৪১ কোটি ডলার বা ১০ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৭ কোটি ৪৫ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে) প্রতিদিন গড়ে দেড়শ কোটি টাকারও বেশি বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে। মোট পরিশোধের মধ্যে ২৯৫ কোটি ডলার ছিল মূল ঋণের কিস্তি এবং ১৫৪ কোটি ডলার ছিল সুদ।
উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমে যাওয়ার চিত্রও স্পষ্ট। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার ৭২ কোটি টাকা। ফলে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এত কম এডিপি বাস্তবায়নের নজির নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ এবং নতুন প্রকল্প অনুমোদনে কঠোর অবস্থানের কারণে উন্নয়ন ব্যয় ও বিদেশি ঋণ ছাড়—দুই ক্ষেত্রেই গতি কমেছে। তবে একই সময়ে পুরোনো মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে।
গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, প্রায় ২০৭ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ছাড় করেছে প্রায় ১৯১ কোটি ডলার। এরপর রাশিয়া দিয়েছে ১০৫ কোটি ডলার, জাপান ৭৯ কোটি ডলার, এআইআইবি ৬৯ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার এবং ভারত ২৭ কোটি ডলার।
তবে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে চিত্র আরও দুর্বল। এডিবি ২৬৮ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশ্বব্যাংক দিয়েছে মাত্র ৮২ কোটি ডলার। এ ছাড়া এআইআইবি ২৫ কোটি ডলার, জাপান ৩১ কোটি ডলার এবং চীন ২৭ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারত বিদায়ী অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের বৈদেশিক ঋণ যেমন বাড়ছে, তেমনি দ্রুত বাড়ছে ঋণ পরিশোধের দায়ও। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বছরে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে ঋণ পরিশোধের এই চাপ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই বৈদেশিক ঋণ অবশ্যই উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে সময়মতো অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করতে হবে।











