বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখন অর্থের সংকট নেই; বরং সংকট অর্থের ব্যবহারে। ব্যাংকগুলোর হাতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তারল্য জমে থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি নেমে এসেছে কয়েক বছরের তুলনায় নিচে। একই সময়ে সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে, আর উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে ব্যাংকে টাকা থাকলেও অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে তার প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।
এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংকিং খাতের এই দ্বৈত চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুন ২০২৬ শেষে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৮১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এক বছরে এ ঋণ বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
তবে ঋণের এই প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি খাতের অবদান সীমিত। জুন শেষে সরকারি খাতে ঋণ ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকায় উঠেছে। এর মধ্যে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেসরকারি ঋণপ্রবাহের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
ব্যাংকে পড়ে আছে অতিরিক্ত তারল্য
তারল্যের চিত্রটি আরও স্পষ্ট। জুন ২০২৬ শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ ছিল ৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। বিপরীতে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা।
ব্যাংকভেদে অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রচলিত বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ৮১১ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে তা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৪৮৪ কোটি এবং বিদেশি ব্যাংকে ১৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। ইসলামী বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ১০ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। বিপরীতে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ১২৯ কোটি টাকার ঘাটতি ছিল।
অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের জোগান থাকলেও সেই অর্থের পর্যাপ্ত ব্যবহার হচ্ছে না। বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নেওয়ার বদলে অপেক্ষা করেন। এতে ব্যাংকের অর্থ অলস পড়ে থাকার পাশাপাশি অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও ধীর হয়ে যায়।
উচ্চ সুদে আটকে যাচ্ছে বিনিয়োগ
ঋণপ্রবাহের ধীরগতির পেছনে উচ্চ সুদহারও বড় কারণ। জুন ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো রেট ছিল ১০ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর ঋণের ভারিত গড় সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং আমানতের গড় সুদহার ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্টে।
উচ্চ সুদে ব্যবসার অর্থায়ন ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ঋণের খরচ ও সম্ভাব্য মুনাফার হিসাব মিলিয়ে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে।
শিল্পঋণে গতি, সিএমএসএমইতে মিশ্র চিত্র
তবে ব্যাংক ঋণের সব খাতে একই ধরনের স্থবিরতা নেই। জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়ে শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছে ২৩ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি। তবে একই সময়ে এসব ঋণের আদায় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ।
ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা—সিএমএসএমই খাতেও ঋণ বিতরণ বেড়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে এ খাতে ঋণ বিতরণ ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়ে ৭০ হাজার ১৭১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে আদায় ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে ৫৫ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকায় নেমেছে। ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই ঋণের অংশ ছিল ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
অন্যদিকে কৃষি ও অকৃষি গ্রামীণ ঋণে তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়ে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। আদায় বেড়েছে ১৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে এখন একটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণের গতি নেই। একই সময়ে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে এবং ঋণের সুদহারও উঁচু। ফলে ব্যাংকের অর্থ যদি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির সরকারি অর্থায়নে বেশি প্রবাহিত হয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগের পুনরুদ্ধার আরও ধীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।











