পুঁজিবাজারের টেকসই বিকাশে সিএফএ-দের বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থনের আহ্বান

Web Photo Card June 7 2026 CFA
ছবি: ডিএসজে

দেশের পুঁজিবাজারের টেকসই বিকাশ, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি শক্তিশালী আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে ফিন্যান্স ও পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের নিখুঁত বিশেষজ্ঞদের বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণ ও নীতিগত সমর্থন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বিনিয়োগের গুণগত মানোন্নয়নে একটি দূরদর্শী, স্থায়ী ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন রাজস্ব নীতি প্রণয়ন অপরিহার্য।

গত শনিবার (০৬ জুন) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে জাকজমকপূর্ণ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশ’-এর “১০ম অ্যানিভার্সারি গালা নাইট” অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, ফিন্যান্সিয়াল ক্রাফটসম্যান ও অর্থনীতিবিদেরা এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। ফিন্যান্স পেশাদারদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সিএফএ ডেজিগনেশন’-এর প্রসার, পেশাগত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের অগ্রগতিতে এক দশকের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে এই গালা নাইটের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান পুঁজিবাজারের সংস্কার ও উন্নয়নে সিএফএ চার্টারহোল্ডারদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থনের ওপর বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি বলেন, “আমি একা এই বিশাল বাজার পরিবর্তন করতে পারব না। বিএসইসিতে আমার যে ছোট টিম আছে, তার চেয়েও বড় টিম আজ আমার সামনে এখানে বসে আছে। আমার এই বিশাল টিমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেন আপনারা—সিএফএ চার্টারহোল্ডাররা।”

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কস্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের সাথে সিএফএ-দের দক্ষতার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যারা চার্টার্ড বা কস্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আমরা করপোরেট, অডিট বা ট্যাক্সেশনের সব বিষয় একটু একটু জানি। কিন্তু সিএফএ-রা হলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনন্য। তারা হলেন ফিন্যান্স, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট এবং ভ্যালুয়েশনের একক ও নিখুঁত বিশেষজ্ঞ। এই পুঁজিবাজারে আপনাদের মেধা ও দক্ষতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”

অংশীজনদের ইতিবাচক পরামর্শ বাস্তবায়নে নিজের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে মাসুদ খান বলেন, “অংশীজনদের কোনো আইডিয়া বা পরামর্শ যদি বাজারের জন্য সত্যিই উপকারী ও বাস্তবায়নযোগ্য হয়, তবে টেক ইট ফ্রম মি—আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তা বাজারে বাস্তবায়ন করব। মন থেকে সমাধান খুঁজলে যেকোনো সমস্যার শতভাগ সমাধান সম্ভব।” এই প্রসঙ্গে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার একটি বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, “পৃথিবীতে যেকোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত তা অসম্ভবই মনে হয়, যতক্ষণ না কেউ একজন তা সম্ভব করে দেখায়।”

অনুষ্ঠানে “কনডুসিভ ফিসকাল পলিসি ফর এ বেটার ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট” শীর্ষক মূল প্রবন্ধে ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশের কর কাঠামো ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবকে বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ওইসিডি এর গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী করের বোঝা প্রতি ১ শতাংশ বাড়লে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ প্রায় ৩.৭ শতাংশ কমে যায়। অথচ বাংলাদেশে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করের উচ্চ হার (২৭.৫%) এবং বার্ষিক অর্থ আইনের মাধ্যমে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ সূচক (বিবিএক্স ২০২৫) অনুযায়ী ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৫৯, যা একটি ‘চ্যালেঞ্জিং ব্যবসায়িক পরিবেশ’ নির্দেশ করে। এই স্থবিরতা কাটাতে তিনি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস)-এর শতভাগ বাস্তবায়ন, মধ্যমেয়াদি রাজস্ব কাঠামো গঠন এবং বাজেট ঘাটতি ৩.৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেন।

অনুষ্ঠানে ফিন্যান্স পেশাদারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে সম্মানিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি, সিটি ব্যাংক পিএলসি, এজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, আইডিএলসি ফিন্যান্স, শান্তা সিকিউরিটিজ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি বাংলাদেশ এবং ইউনাইটেড কমাশিয়াল ব্যাংক পিএলসি।
এছাড়া, বিগত ৫ বছরে সিএফএ প্রোগ্রামে সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী নিবন্ধনের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ও এফবিএস, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)-এর প্রেসিডেন্ট, এসিসিএ বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড, বিএমবিএ এবং ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)-এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

পুঁজিবাজারের টেকসই বিকাশ ও বিনিয়োগ পেশার মানোন্নয়নে রেগুলেটরদের সাথে যৌথভাবে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশ-এর এই গালা নাইট সমাপ্ত হয়।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top