কারসাজি রুখতে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের ‘রিয়েল-টাইম’ অ্যাকশন

Web Photo Card June 4 2026 BusinessNewsBD
ছবি: ডিএসজে

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসের এক চরম সংকটকালীন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এসেছে। বাজারে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম ধরে রাখার বিতর্কিত ‘ফ্লোর প্রাইস’ (সর্বনিম্ন সীমা) ব্যবস্থা চিরতরে বাতিলের ঘোষণা দিয়ে কারসাজিকারকদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে নতুন কমিশন। একই সঙ্গে ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং ও কৃত্রিম দর বৃদ্ধি ঠেকাতে জেড ক্যাটাগরির শেয়ারের ওপর ‘রিয়েল-টাইম’ নজরদারিসহ প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিত করার মেগা ক্ষমতা স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন পুরো কমিশন পদত্যাগের পরপরই আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরের মধ্যে নতুন কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেশের প্রখ্যাত করপোরেট ব্যক্তিত্ব, ক্রাউন সিমেন্টের গ্রুপ সিইও এবং বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিশনের এই যুগান্তকারী ও কঠোর সংস্কার রোডম্যাপের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে নতুন তিনজন কমিশনার—আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা তানভীর হাবিব রহমান ও ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ আল তারিক উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক।

নতুন কমিশনের দূরদর্শী ভিশন প্রকাশ করে চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে কেবল ক্ষুদ্র বা খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর একটি ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী-নির্ভর ‘ইমার্জিং মার্কেট’ বা উদীয়মান বাজারে রূপান্তর করতে চাই।” তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে বাজারের নানা অনিয়ম, ভুল নীতি ও দুর্বল সুশাসনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, যার ফলে বাজারের ওপর থেকে আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। আজকের বহুমাত্রিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির তুলনায় দেশের পুঁজিবাজার অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং এই স্থবির অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো এখন সময়ের দাবি।

বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান পুঁজিবাজারে সুশাসন ও গতিশীলতা ফেরাতে ‘স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘ডিজিটাইজেশন’-এর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, অতিরিক্ত রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা ও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় এবং ভালো কোম্পানিকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করে। তাই আন্তর্জাতিক হিসাবমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর চাপানো বিস্তৃত ত্রৈমাসিক বা অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলের বর্তমান অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্সের বোঝা পুনর্বিবেচনা ও সহজ করা হবে। কমিশনের দর্শন হবে অত্যন্ত সহজ—যেখানে প্রয়োজন সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে সম্ভব সেখানে নিয়ম কানুনের সর্বোচ্চ সরলীকরণ।

ডিজিটাইজেশনকে এই সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে মাসুদ খান জানান, নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, তথ্যের প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার তদারকি ও বিনিয়োগকারী সেবাসহ পুরো পুঁজিবাজার ইকোসিস্টেমকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। আইপিও আবেদন, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক আবেদন ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হবে, যাতে ম্যানুয়াল বা কাগজ-নির্ভর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চিরতরে অবসান ঘটে।

বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির তীব্র ঘাটতি। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে সফল বহুজাতিক কোম্পানি, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ স্থানীয় করপোরেটগুলোকে বাজারে আনতে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে নতুন কমিশন। এর অংশ হিসেবে কোনো নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই উপযুক্ত ও সফল কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং’ বা সরাসরি তালিকাভুক্তি কাঠামো প্রবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করতে সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে যৌথভাবে একটি বিশেষ ‘তালিকাভুক্ত কোম্পানি সুবিধা কর্মসূচি’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অধীনে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারে আরও বড় ব্যবধান সৃষ্টি করা, পৃথক কর প্রশাসন ব্যবস্থা, ঝুঁকিভিত্তিক কর মূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত অডিট হ্রাস এবং করপোরেট বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির মতো নীতিগত সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে করপোরেট বাংলাদেশের কাছে ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকার চেয়ে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

বাজারের সততা রক্ষা ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএল-কে সমন্বিত করে একটি আধুনিক ও সমন্বিত রিয়েল-টাইম নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প স্কিম এবং ফ্রন্ট রানিংয়ের মতো যেকোনো বাজার কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। গুরুতর অনিয়ম বা তথ্য ফাঁসের যৌক্তিক সন্দেহ দেখা দিলে বিএসইসির তত্ত্বাবধানে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করার ল্যান্ডমার্ক ক্ষমতা দেওয়া হবে।

চেয়ারম্যান কারসাজিকারকদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য কৃত্রিমভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা বা বাজারের স্বাভাবিক উত্থান-পতন ঠেকানো নয়; আমাদের মূল কাজ তথ্যের সমান প্রাপ্যতা ও বাজারভিত্তিক ‘ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার’ নিশ্চিত করা। মূল্য নির্ধারণ করবে মুক্ত বাজার, কোনো সিন্ডিকেট বা কারসাজি নয়।” তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সৎ বিনিয়োগকারী এবং নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ীদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, তবে যারা আস্থার অপব্যবহার করবে, তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এড়ানোর তাৎক্ষণিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষাকে কমিশনের নিয়ন্ত্রক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ করে মাসুদ খান দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইসকে একটি ক্ষতিকর ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারে আর কখনো কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে, যাতে বাজার তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারে।

নতুন চেয়ারম্যান বলেন, আস্থা কোনো ফাঁকা বক্তৃতা বা প্রশাসনিক জোর খাটানোর মাধ্যমে তৈরি হয় না; আস্থা আসে সততা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহিতা থেকে। নতুন কমিশনের সাফল্য কোনো কাগুজে ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top