বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে নগদ অর্থনির্ভর লেনদেন থেকে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোতে চায় সরকার। ডিজিটাল লেনদেন শুধু অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি বদলাবে না; বরং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়াবে, দুর্নীতি কমাবে, কর আদায় সহজ করবে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে সংকুচিত করবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করবে।
শনিবার (৪ জুলাই) চট্টগ্রামে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সকালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এবং পরে পূবালী ব্যাংক পিএলসির আয়োজিত ‘এক দেশ, এক কিউআর—লেনদেনে বাংলা কিউআর’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি ক্যাশলেস অর্থনীতিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার পুরো বাংলাদেশকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। শুধু সরকারি সেবা নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজার, বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব ধরনের আর্থিক লেনদেন একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তার ভাষায়, সরকারি সেবা ডিজিটাল হলে মানুষের সরকারি অফিসে ঘুরে ঘুরে সেবা নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগও কমে আসবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্যাশলেস অর্থনীতির আরেকটি বড় সুবিধা হলো অর্থপ্রবাহের একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হয়। ফলে কর ফাঁকি, অর্থপাচার এবং অপ্রদর্শিত লেনদেন শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হয়। একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিকতার পরিধি বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ‘এক দেশ, এক কিউআর’ উদ্যোগ চালু করেছে। এর আওতায় যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাপ ব্যবহার করে একটি অভিন্ন বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে অতিরিক্ত কোনো চার্জ ছাড়াই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে কাঁচাবাজার, মুদি দোকান কিংবা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সব জায়গাতেই কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন করা যাবে। এতে নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি, টাকা গোনা কিংবা খুচরা ফেরত দেওয়ার মতো সমস্যার অবসান হবে। একটি স্মার্টফোন দিয়েই কয়েক সেকেন্ডে মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় তারা দ্রুত এই ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। শুরুতে বয়স্কদের কিছুটা সময় লাগলেও ধীরে ধীরে এটিই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর লেনদেন ব্যবস্থায় পরিণত হবে।
নিজের সাম্প্রতিক চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নগদ অর্থ ব্যবহার করা হয় না। কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্টই এখন প্রধান মাধ্যম। বাংলাদেশও একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
ক্যাশলেস অর্থনীতির এই পরিকল্পনাকে সরকারের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য শুধু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।
তিনি জানান, চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাবে রূপান্তর, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারায় প্রায় ৬০০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ফ্রি জোন প্রতিষ্ঠা, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কার্গো ও যাত্রী পরিবহনের আঞ্চলিক হাবে উন্নীত করা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা একই অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে বড় বাজেট বাস্তবায়ন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
এরপর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রবৃদ্ধির নতুন ধাপ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদের তৃতীয় ও চতুর্থ বছর থেকে অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। ডিজিটাল লেনদেন, আধুনিক অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার সমন্বয়েই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে তিনি আশা করেন।













