কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতি বাঁচানো অসম্ভব: সিপিডি

Web Photo Card June 4 2026 FuelPriceHike
ছবি: সিপিডির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের চরম বিশৃঙ্খলা এবং সাড়ে ৯ শতাংশ ছুঁইছুঁই খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি এক নতুন মরণকামড় বসিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও দেশের ভেতর দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এই খরচের বোঝা চাপানোর কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। অর্থনীতির কিছু সূচকে সাময়িক বা আপাত স্বস্তির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে বহু অমীমাংসিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ঢাকা পড়ে আছে। এমতাবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন এবং বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সংকটের আবর্তে থাকা দেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ ও সতর্কবার্তা তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানসহ অন্যান্য গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে দেশের আর্থিক, সামাজিক ও উৎপাদনশীল খাতগুলো এক নজিরবিহীন ও বহুমাত্রিক সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইন ও বিধি-বিধানের যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব এবং জবাবদিহিতার তীব্র ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আকাশচুম্বী, যা তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি একলাফে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছে গেছে। অথচ এই সময়ে মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির গতির চেয়ে অনেক কম। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে দেশের বাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ এবং পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি পরিবহণ খাতে আঘাত হেনেছে, যা নিত্যপণ্যের বাজারকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

এছাড়া গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও চরম নৈরাজ্য দেখা গেছে। গত মার্চ মাসে যে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে জুন মাসে তা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায়। এর ওপর সম্প্রতি বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি এই সংকটকে আরও বহুদূর নিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সিপিডি।

সিপিডির গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমতির দিকে থাকার পরও দ্বিতীয় দফায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল না। সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা দামের কাঠামো করা যেত।

ব্যাংক খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সিপিডি। কাগজে-কলমে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ৩৫.৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের মার্চে কমে ৩২.২৬ শতাংশে নামার যে চিত্র দেখানো হচ্ছে, তা আদতে এক ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। সিপিডি জানিয়েছে, ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং জোরপূর্বক রাইট-অফের (অবলোপন) মাধ্যমে খেলাপি ঋণের অঙ্ক জোর করে কম দেখানো হয়েছে, যা ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্যের প্রতিফলন নয়।

বর্তমানে ১৭টি ব্যাংকের ওপর চলমান ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর)’ কার্যক্রমের মধ্যে মাত্র ছয়টি ব্যাংকের প্রাথমিক পর্যালোচনায় সরকারি তথ্যের চেয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ও গোপন খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। এটি ব্যাংক খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে সরকারি অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জুলাই-মার্চ মেয়াদে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এনবিআর যদি তাদের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে চায়, তবে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে ৮৪.৬ শতাংশ অলৌকিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা সম্পূর্ণ অসম্ভব ও বাস্তবতাবিবর্জিত।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক নতুন সংকটের পূর্বাভাস দিয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমের অজুহাত তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শশুল্ক বা শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের চেষ্টা করতে পারে। তবে বিষয়টির পেছনে মানবিক উদ্বেগের চেয়ে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বেশি কাজ করছে।

মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের শিশুশ্রম নিয়ে মাথা ব্যথা থাকত, তবে তারা শুল্কের খক্ষ না চালিয়ে উন্নয়ন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। কিন্তু সহায়তার পরিবর্তে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের আলোচনা রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন তৈরি করছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে আপাত স্বস্তির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে বহু অমীমাংসিত দুর্বলতা রয়ে গেছে। এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top