বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস (জিএনএফসি) এবং ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওই সময়ে দেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে আইপিসি স্কেলের ‘ফেজ-৩’ বা তার ওপরের স্তরে অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি ‘জরুরি সংকট’ হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে দেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৩৫ লাখে পৌঁছালেও ২০২৫ এবং ২০২৬-এর শুরুতে তা কিছুটা কমে ১ কোটি ৬০ লাখে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি এখনো গত এক দশকের গড় হারের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের প্রলয়ঙ্কারি বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড় রেমালের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের কৃষি খাত। ফসলহানি এবং গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতি প্রান্তিক মানুষের খাদ্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
গ্লোবাল নেটওয়ার্কের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এই খাদ্য সংকটের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের নেওয়া টাস্কফোর্স বা শুল্ক হ্রাসের মতো পদক্ষেপগুলো তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর কোনো সুফল দিতে পারেনি। বিশেষ করে শহুরে দরিদ্র এবং দিনমজুর শ্রেণির মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তারা এখন পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে কেবল পেট ভরানোর মতো খাবারে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।
খাদ্য সংকটের পাশাপাশি দেশে পুষ্টিহীনতা নিয়েও মারাত্মক উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ সময়কালের মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ শিশু (৬-৫৯ মাস বয়সী) তীব্র পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার শিশু ‘সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশন’ বা অতি তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যা সরাসরি জীবননাশের হুমকি তৈরি করছে। এছাড়া ১ লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারীও অপুষ্টির শিকার, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না আসা এবং সরবরাহ চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে। সরকার বিভিন্ন সময়ে বাজার তদারকি ও আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা দিলেও প্রান্তিক ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব এখনো নগণ্য।
গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৬ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে চলতি বছরও বাংলাদেশে এই খাদ্য ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে কক্সবাজার ও সুনামগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে খাদ্য সংকটের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি পরামর্শ দিয়েছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে কেবল পুলিশি তদারকি নয়, বরং ওএমএস ও টিসিবি-র মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে শহর ও গ্রামের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে দিতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে কৃষি পুনর্বাসন এবং ছোট উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান না করলে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্থবির করে দিতে পারে।













