দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের বোঝা ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অংক ছিল ৩২১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়েছে ৩০ কোটি ডলারেরও বেশি।
ইআরডি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, কিস্তি পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর শেষে বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে। এখন আমদানি দায় পরিশোধের পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায় বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ঋণের কিস্তির পরিমাণ বাড়লেও কমে গেছে প্রতিশ্রুতি ও ঋণের অর্থছাড়। ইআরডির তথ্যমতে, অর্থবছরের এই সময়ে বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি ৪১ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৩০০ কোটি ৫২ লাখ ডলার। প্রতিশ্রুতির এই নিম্নগতি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ অর্থায়নে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে অনুদান বা গ্র্যান্টের ক্ষেত্রে। গত অর্থবছরের ৩৩ কোটি ডলারের অনুদান কমে এবার ১৫ কোটি ৩৩ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। তবে বড় বড় ঋণ বা লোন পাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রায় আগের বছরের সমপর্যায়েই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি অর্থছাড় বা ডিসবার্সমেন্টের চিত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৩৮৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪৮০ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার।
হিসাব অনুযায়ী, ৯ মাসে অর্থছাড় কমেছে প্রায় ৯০ কোটি ডলারেরও বেশি। প্রকল্প সহায়তা খাতে টাকা আসার গতি কমে যাওয়ায় দেশের মেগা প্রকল্পসহ বড় বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন গতি ধীর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, বড় প্রকল্পগুলোর চুক্তি প্রক্রিয়ায় জটিলতা এবং দরপত্র মূল্যায়নে বিলম্বের কারণে অর্থছাড় কম হচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও দাতা সংস্থাগুলোর অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কারণেও প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে অবশ্য সামান্য অগ্রগতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে, যা গত বছর ছিল সাড়ে ৩ কোটি ডলার। তবে সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তার তুলনায় এই অংক অত্যন্ত নগণ্য।
কেবল বিদেশি ঋণ নয়, সরকারের দেশি উৎস থেকেও ধার করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের নির্ভরতা এখন চরমে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছে। যদিও পরবর্তীতে কিছু ঋণ শোধ করার ফলে বর্তমানে নিট ঋণের স্থিতি ৯৩ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে।
গত কয়েক বছর ধরেই বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই চাপ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল। গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে বাংলাদেশ মোট ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করেছে, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমা এবং একই সাথে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়া অর্থনীতির জন্য একটি বিপজ্জনক সংকেত। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা এবং ঋণের স্থায়িত্ব নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।













