বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন রণকৌশলে বাংলাদেশ

ছবি: বাসস
ছবি: বাসস

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-র গভর্নিং বোর্ডের পৃথক সভায় এসব নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের প্রথম ‘ডিফেন্স ইকোনমিক জোন’ বা প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে নগদ প্রণোদনা এবং ছয়টি বিনিয়োগ সংস্থাকে একীভূত করার মতো বড় সিদ্ধান্তগুলো দেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন মাইলফলক

মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)-এর ভেতরে প্রায় ৮৫০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল। এই জমিটি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে সেই প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় এখন সেখানে সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, “সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের যৌথ মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী প্রতিরক্ষা পণ্য উৎপাদন এবং ধাপে ধাপে প্রযুক্তি স্থানান্তর এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।”

প্রবাসী বিনিয়োগে নগদ প্রণোদনা

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) জন্য বিশেষ স্বীকৃতি ও প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। নতুন নীতি অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তবে তিনি বিনিয়োগের ১.২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলেন, “ব্যক্তিগত ভোগের জন্য অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে যারা শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ আনবেন, এই নীতির মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা হবে। প্রবাসীরা তাদের বসবাসরত দেশগুলোর সমাজ ও বিনিয়োগ মহলে যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রাখেন, তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।”

এছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রথম পর্যায়ে চীনে এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দপ্তর খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিনিয়োগ সেবায় ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’

বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে ছয়টি সংস্থা—বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-কে একীভূত করে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপ অনুমোদন করা হয়েছে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, বর্তমানে প্রতিটি সংস্থার প্রধান হিসেবে সরকারপ্রধান থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়, যার ফলে অতীতে বোর্ড সভাগুলো নিয়মিত হয়নি। তিনি বলেন, “একীভূত কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হবে। আদর্শভাবে প্রতি ছয় মাস পরপর বোর্ড সভা হওয়া উচিত।” এই প্রক্রিয়াটি আইনগত ও কাঠামোগতভাবে সম্পন্ন করতে একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আনোয়ারায় প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৬৫০ একর জমির ওপর দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এর প্রাথমিক বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে।

আশিক চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রপ্তানি বৈচিত্র্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কুষ্টিয়া চিনিকলকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে সেখানে প্রায় ২০০ একর জায়গাজুড়ে একটি আধুনিক শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হবে, যা স্থানীয় শিল্পায়নে গতি আনবে।

মহেশখালীকে কেন্দ্র করে মহাপরিকল্পনা

বাংলাদেশের জ্বালানি ও লজিস্টিকস খাতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে মহেশখালীকে গড়ে তুলতে ২০২৫-২০৩০ মেয়াদী একটি কৌশলগত রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা)।

এই কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, আগামী পাঁচ বছরে মহেশখালীর গভীর সমুদ্রবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ কার্যকরের পাশাপাশি দ্রুত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) টার্মিনাল স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এসব অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সেখানে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি বিশেষায়িত হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পৌর এলাকায় শিল্পায়নের নতুন নীতি

গভর্নিং বোর্ড দেশের ৩৩১টি পৌরসভার অভ্যন্তরে পরিত্যক্ত বা বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে কৃষিজমি নষ্ট না করেই শহরের অবকাঠামো ব্যবহার করে শিল্পায়ন সম্ভব হবে।

আগে আইনি জটিলতার কারণে এটি সম্ভব ছিল না, তবে বর্তমান নীতিগত পরিবর্তনের ফলে নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই দ্রুত কলকারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top