টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি

DSJ Web Photo July 6 2026 Inflation
ডিএসজে

জুন মাসে দেশের মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। তবে সেই কমায় সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরেনি। কারণ টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। একই সময়ে মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে তার চেয়েও দ্রুত। ফলে বাজারে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেও প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে উঠছে সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.১৬ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৯.৪২ শতাংশ। মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি ০.২৬ শতাংশ পয়েন্ট কমলেও এটি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে। এর আগে এপ্রিল ও মে মাসেও মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। ফলে টানা তৃতীয় মাস উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্র থেকে বের হতে পারেনি দেশের অর্থনীতি।

এক বছর আগের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০.৬৮ শতাংশ পয়েন্ট।

বিবিএসের হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৬৮ শতাংশ। যদিও এটি আগের অর্থবছরের ১০.০৩ শতাংশ থেকে কম, তবু মূল্যস্ফীতি এখনও এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে।

জুন মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার পেছনে প্রধান কারণ খাদ্যপণ্যের দামে আংশিক স্বস্তি। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৬ শতাংশ, যা জুনে কমে ৮.৬০ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু এটিও গত বছরের জুনের তুলনায় অনেক বেশি। এক বছর আগে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৩৯ শতাংশ।

খাদ্যবহির্ভূত খাতেও সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। মে মাসের ৯.৭১ শতাংশ থেকে জুনে তা নেমে এসেছে ৯.৬১ শতাংশে। তবে বাসাভাড়া, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবার ব্যয় এখনও গত বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৫ সালের জুনে এই খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের বড় অংশ এখন খাদ্যবহির্ভূত খাতে চলে যাচ্ছে। ফলে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

মূল্যস্ফীতির এই চাপের পেছনে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। এরপর মে মাসের শেষ দিকে বিদ্যুতের দামও সমন্বয় করা হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয়ে। সেই ব্যয় ধাপে ধাপে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্যে যুক্ত হয়েছে।

এর ফলে বাজারে শাকসবজি, মাছ, মাংস, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

গ্রাম ও শহর—দুই এলাকাতেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও চাপ তুলনামূলক বেশি গ্রামাঞ্চলে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুনে গ্রামাঞ্চলের সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.২৩ শতাংশ, যেখানে শহরে তা ৯.০১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫২ শতাংশ, আর শহরে ৮.৭৬ শতাংশ। তবে বার্ষিক তুলনায় গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধি শহরের তুলনায় বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ পরিবারগুলোর ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্যের পেছনে যায়। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের ওপর প্রভাবও তুলনামূলক বেশি পড়ে।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা মানুষের আয়।

জুন মাসে জাতীয় পর্যায়ে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার হয়েছে ৮.১৮ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় যে হারে বেড়েছে, বাজারদর বেড়েছে তার চেয়ে দ্রুত। এর অর্থ, প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এই পরিস্থিতিতে একই পরিমাণ আয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক পরিবারকে খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে, চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয় পিছিয়ে দিতে হচ্ছে, আবার অনেকেই ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু সুদের হার বৃদ্ধি বা মুদ্রানীতি কঠোর করলেই হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর মতো কাঠামোগত পদক্ষেপও সমান জরুরি।

তাদের মতে, জুন মাসের পরিসংখ্যান স্বল্পমেয়াদে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও তা থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যচাপ এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর সঙ্গে যদি আয় বৃদ্ধির গতি মূল্যস্ফীতির নিচেই থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top