দীর্ঘদিন ধরে ডলার সংকট, রিজার্ভের চাপ ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতায় থাকা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ডলারের সরবরাহ বাড়ায় বাজার থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি পরিশোধের চাপ কিছুটা কমে আসা এবং বৈদেশিক লেনদেনে উন্নতি—এই তিনটি বিষয় মিলেই বদলে দিচ্ছে বাজারের গতিপথ।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এর বিপরীতে আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিট ৫০৩ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান আমদানির জন্য ডলার সরবরাহকারী থেকে ডলার ক্রেতায় পরিণত হয়েছে।
কেন এখন ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক
এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স। এমসিসিআইয়ের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। শুধু এপ্রিল-জুন প্রান্তিকেই এসেছে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়লেও একই সময়ে আমদানি পরিশোধের চাপ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। এমসিসিআই বলছে, এই পরিস্থিতিতে বাজারে অতিরিক্ত ডলার জমা হলে বিনিময় হার ও বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনেছে। এপ্রিল ২০২৬-এ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার বাজারে ডলার কেনা শুরু করে; পরবর্তী সময়ে এ কার্যক্রম আরও জোরালো হয়।
জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক ব্যাংক থেকে ডলার কেনার তথ্যও প্রকাশ করেছে। ১ জুন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৫৪ মিলিয়ন ডলার কেনা হয় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে।
রিজার্ভে বড় উল্লম্ফন
ডলার কেনার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুন ২০২৬ শেষে দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা মে মাসের ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বেশি।
তবে রিজার্ভের হিসাব বুঝতে গ্রস রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হিসাব করা রিজার্ভের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ রিজার্ভের উন্নতি বাস্তব, তবে কোন হিসাবপদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বৈদেশিক লেনদেনে বড় পরিবর্তন
রিজার্ভ বৃদ্ধির সঙ্গে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এমসিসিআইয়ের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টসে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে উদ্বৃত্ত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এর পেছনে শুধু রেমিট্যান্স নয়, আর্থিক হিসাবে প্রবাহ বৃদ্ধিও ভূমিকা রেখেছে। এমসিসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত বেড়ে ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি-আমদানিতেও নতুন সংকেত
রপ্তানি খাতে বছরজুড়ে বড় গতি না থাকলেও অর্থবছরের শেষ দিকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেছে। জুনে পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে পুরো অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, অর্থবছরে মোট আমদানি বেড়ে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এমসিসিআইয়ের পর্যবেক্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় এবং শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের চাহিদা পুনরুদ্ধার হওয়ায় অর্থবছরের শেষ দিকে আমদানিতে গতি এসেছে।
ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা কতটা টেকসই?
তবে রিজার্ভ বাড়া ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা মানেই বৈদেশিক মুদ্রার সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও বেসরকারি ঋণের গতি দুর্বল রয়েছে। এমসিসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি।
অর্থাৎ বৈদেশিক খাতে স্বস্তি এলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সেই স্বস্তির পুরো প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—বাড়তি ডলার কেনার মাধ্যমে রিজার্ভের যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা কতটা টেকসই করা যায়। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখা, রপ্তানি বাড়ানো, আমদানি ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা এবং একই সঙ্গে বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা—আগামী দিনে এই ভারসাম্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এমসিসিআইয়ের মূল্যায়নও মূলত একই দিকে ইঙ্গিত করছে: বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতার বড় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে রূপ দিতে হলে মূল্যস্ফীতি কমানো, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়া জরুরি।











