গ্রাহকের আমানতের সুদ বা মুনাফা থেকে কর কেটে নেওয়ার পরও সেই অর্থ যথাসময়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ ও অনিয়ম ধরা পড়েছে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে। কোথাও কর কর্তনের হার ঠিক রাখা হয়নি, কোথাও আবার গ্রাহকের কর-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কর্তন করা অর্থ ব্যাংকের হিসাবে পড়ে থাকায় পরবর্তী সময়ে কর সমন্বয় ও নিরীক্ষাতেও তৈরি হচ্ছে জটিলতা।
এ অবস্থায় আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে আয়কর কর্তন এবং সরকারি কোষাগারে জমার পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোরভাবে আইন ও বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে কর জমা না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ-১ (বিআরপিডি) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার লেটার জারি করেছে। বিআরপিডি-১ সার্কুলার লেটার নং-২৭-এর মাধ্যমে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আমানতের সুদ বা মুনাফা থেকে যথাযথভাবে উৎসে কর কর্তন এবং তা নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার কারণে একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে কর সমন্বয় ও নিরীক্ষার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে পুরো প্রক্রিয়ায় আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১০২ অনুসারে গ্রাহকের সঞ্চয়ী, স্থায়ী আমানত, ডিপিএসসহ যেকোনো ধরনের আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক বা প্রাপকের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে কর কর্তন করতে হবে। অর্থাৎ সব ধরনের গ্রাহকের ক্ষেত্রে একই হারে কর কাটার সুযোগ নেই।
কর কর্তনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বা পিএসআর (প্রুফ অব সাবমিশন অব রিটার্ন)-এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪২ অনুযায়ী কোনো করদাতা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হলে নির্ধারিত হারের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি উৎসে কর কর্তন করতে হবে।
অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় কর-সংক্রান্ত প্রমাণপত্র না থাকলে ব্যাংককে স্বাভাবিক হারের বাইরে অতিরিক্ত কর কাটতে হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের শ্রেণি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে কর কর্তন করলে ব্যাংকগুলোকে পরবর্তী সময়ে জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
কর্তন করা কর ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে জমিয়ে রাখার বিষয়েও সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গ্রাহকের কাছ থেকে কেটে নেওয়া অর্থ কোনোভাবেই নির্ধারিত সময়ের বেশি ব্যাংকের জেনারেল লেজার বা অন্য কোনো হিসাবে রাখা যাবে না। কর্তনের পর বিধিবদ্ধ সময়ের মধ্যেই তা সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে হবে।
উৎসে কর জমার সময়সীমাও সার্কুলারে স্পষ্ট করা হয়েছে। জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত যেকোনো সময়ে কর্তন করা কর পরবর্তী মাসের শেষ তারিখ থেকে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
তবে জুন মাসের কর জমার ক্ষেত্রে সময়সীমা আরও কঠোর। ১ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সময়ে কর্তন করা কর কর্তনের তারিখ থেকে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। আর ২১ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে কর কর্তন বা সংগ্রহ করা হলে তা পরবর্তী দিনই সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, উৎসে কর কর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় বিবরণী, চালান ও অন্যান্য নথির কপিও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে কর সমন্বয়, যাচাই ও নিরীক্ষার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোকে আয়কর আইন, ২০২৩ এবং উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৩-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪৫-এ অর্পিত ক্ষমতাবলে জারি করা নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথাও সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য শুধু গ্রাহকের আমানতের সুদ বা মুনাফা থেকে সঠিক হারে কর কেটে নেওয়াই নয়, কর্তনের পর সেই অর্থ কখন, কীভাবে এবং কোন নথির ভিত্তিতে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হচ্ছে—সেটিও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এতে উৎসে কর ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর দায়বদ্ধতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়েও শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য রয়েছে।











