রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন কৌশল হিসেবে ছোট ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে নীতিমালা চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের সহযোগিতা আরও জোরদারের বার্তা দিয়েছে সরকার।
এ লক্ষ্যে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিডার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে বিনিয়োগ, রপ্তানি, জ্বালানি, এসএমই, ব্যবসার পরিবেশ এবং শিল্পায়নের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিডা সূত্র জানিয়েছে, পুঁজি ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের অধিকাংশ এসএমই উদ্যোক্তা সরাসরি রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। ফলে তারা বড় রপ্তানিকারকদের সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এই বাস্তবতায় মূল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নে বিডার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার একটি প্রাথমিক রূপরেখাও সরকারের সামনে তুলে ধরেন। এ লক্ষ্য অর্জনে নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বহুমুখীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে সেগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলো সরকার যেমন উপলব্ধি করছে, ব্যবসায়ীরাও তেমনি তা অনুধাবন করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সময়ে শুরু হওয়া সরকার-ব্যবসায়ী সংলাপ অব্যাহত থাকবে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই আবারও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে সরকার। যত বেশি আলোচনা হবে, তত বেশি সমস্যা চিহ্নিত করা যাবে এবং কার্যকর সমাধানও সহজ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বৈঠকে জানানো হয়, গত ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে ব্যবসায়ীরা ২৮টি সমস্যা তুলে ধরেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে ২১টি বিষয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি সাতটি বিষয় এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বৈঠকে গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পাশাপাশি তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল অনুমোদন এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সালের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহে স্থায়ী সমাধান আসবে বলে আশা করছে সরকার।
এ ছাড়া বৈঠকে ব্যবসায়ীরা বিএসটিআইয়ের বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার গড়ে উঠলে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান যাচাই দ্রুত হবে এবং রপ্তানি ব্যয়ও কমবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এটি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক সংলাপের অংশ। বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগকারীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকার আন্তরিক এবং এ ধরনের নিয়মিত সংলাপ ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সড়ক, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেসরকারি খাতের পক্ষে প্রাণ-আরএফএল, মেঘনা, ওয়ালটন, এসিআই, ইনসেপ্টা, ডিবিএল, এপেক্স, র্যাংগস, যমুনা, আবুল খায়েরসহ দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।











