স্বাধীনতার ইতিহাসে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন

DSJ Web Photo DevelopmentBudget
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

শেষ মাসে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেও ইতিহাসের সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড এড়াতে পারেনি সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা স্বাধীনতার পর সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধীরগতি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশের উন্নয়ন ব্যয়ের এই উদ্বেগজনক চিত্র। সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, অর্থাৎ মোট বরাদ্দের মাত্র ৬৭.৫২ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, এডিপি বাস্তবায়নের হার টানা চার বছর ধরে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাস্তবায়ন হয়েছিল ৯২.৭৪ শতাংশ। পরের বছর তা কমে ৮৫.১৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০.৬৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮.১৮ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ অর্থবছরে তা আরও কমে নতুন সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। একই সময়ে উন্নয়ন বাজেটের আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। জুন মাসে এসে এক মাসেই ব্যয় করা হয়েছে ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরের বেশির ভাগ সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর রেখে শেষ মুহূর্তে ব্যয় বাড়ানোর দীর্ঘদিনের ‘জুন ক্লোজিং’ সংস্কৃতি এবারও অব্যাহত ছিল। তবে শেষ মুহূর্তের সেই তৎপরতাও সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের রেকর্ড ঠেকাতে পারেনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরেই এডিপি বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতির প্রতিফলন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হলে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খাতভিত্তিক চিত্রও উদ্বেগজনক। সরকারি অর্থায়নের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬৩.৭৯ শতাংশ এবং প্রকল্প ঋণ ও অনুদানের ব্যবহার ৬৯.২০ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সরকারি বরাদ্দের মাত্র ২৯.৬৬ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বাস্তবায়ন ২৯.৯০ শতাংশ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৬০.৮৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৬৫.৩০ শতাংশ। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েও বাস্তবায়ন করেছে ৮২.০৪ শতাংশ।

বিদেশি অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্প ঋণ ও অনুদানের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪৯ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ বাস্তবায়ন হার ৬৯.২০ শতাংশ। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশি অর্থায়নের ব্যবহার ছিল ৯২.৬৬ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বিদেশি সহায়তার মাত্র ৩৮.২১ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৩২.৭২ শতাংশ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৮.৪৯ শতাংশ ব্যবহার করতে পেরেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বৈদেশিক ঋণের শর্ত পূরণে বিলম্ব—সব মিলিয়ে এডিপি বাস্তবায়ন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

তাদের মতে, উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রকল্প নির্বাচন, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, জবাবদিহি এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি বিনিয়োগ অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারবে না। বর্তমান বাস্তবতায় এডিপির এই রেকর্ড নিম্নগতি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top