নৌপথে পণ্য পরিবহন সড়কের চেয়ে ৬০% সাশ্রয়ী

DSJ Web Photo InlandWaterways
ছবি- ডিসিসিআই

সড়কপথের তুলনায় নৌপথে পণ্য পরিবহনে ব্যয় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কম এবং জ্বালানি খরচও চার থেকে ছয় গুণ কম হয়। অথচ দেশের মোট পণ্য পরিবহনের প্রায় ৭৭ শতাংশ এখনও সড়কপথনির্ভর। এই বাস্তবতায় খাল ও নদীপথ পুনরুদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণকে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় কমানো, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

বুধবার রাজধানীতে ডিসিসিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বৃত্তাকার নৌপথের পুনরুজ্জীবন এবং অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণে খাল খনন কর্মসূচির ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞরা বলেন, নদী ও খালকে কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধার করা গেলে শুধু পরিবহন ব্যয়ই কমবে না, বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি, শিল্প, পর্যটন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যেও বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, রাজধানীর চারপাশের খালগুলো নগরজীবনের রক্তনালীর মতো হলেও দখল ও দূষণের কারণে সেগুলোর অনেকটাই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে খালগুলোর পারস্পরিক সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি জানান, খাল পুনঃখননের পাশাপাশি সেগুলো সংরক্ষণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিল্পকারখানার বর্জ্য যেন নদীতে না পড়ে, সে জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্পে স্বল্প ব্যয়ে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (ইটিপি) স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ মূল প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের ১,৪১৫টির বেশি নদীর মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ ও পলি জমার কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমেই সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে, যা ব্যবসার ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, রাজধানীর চারপাশের চারটি নদীর ১১২ কিলোমিটার নৌপথকে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে যানজট কমবে, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে উঠবে এবং পণ্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, নৌপথে আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) উন্নয়ন এবং ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, নদী ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ কারণে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর তারা জোর দেন।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়—এমন অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি খাল খননের সময় পানির স্বাভাবিক গতিপথ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নদী ব্যবস্থাপনায় একক দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গঠনেরও আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবেদ হোসেন বলেন, প্রকল্প থাকলেও অনেক সময় বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতায় বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। নদী দূষণ রোধে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যমান নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নদীর সীমানা সংরক্ষণ, দখলমুক্তকরণ, নাব্যতা রক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা গেলে অভ্যন্তরীণ নৌপথ আবারও দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে নদীকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তারা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top