বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য শুধু মৌসুমি সংকট বা বাজার তদারকির ঘাটতির কারণে নয়; এর পেছনে রয়েছে কৃষি ও লজিস্টিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। এই বাস্তবতা তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে কমাতে হলে লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে নয়, কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাজারব্যবস্থা, মুনাফার মার্জিন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করলেও বাংলাদেশে তা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ দেশের উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হিসেবে ধরা হয়, সেখানে বাংলাদেশে এই হার প্রায় ১৬ শতাংশ। পরিবহন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামে পড়ে।
তিনি বলেন, কৃষিপণ্যের বাজারে তথ্যের অসমতা (মার্কেট অ্যাসিমেট্রি) কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক কৃষক বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলেও একই ফসল উৎপাদন অব্যাহত রাখছেন, কারণ বাজারের চাহিদা, মূল্যপ্রবণতা কিংবা বিকল্প উৎপাদন পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছায় না।
এই সমস্যা সমাধানে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কৃষিপণ্যের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এতে কোন স্তরে অস্বাভাবিক ব্যয় বা মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে তা সহজেই শনাক্ত করা যাবে এবং বাজারে অপ্রয়োজনীয় বা অনানুষ্ঠানিক ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি ৭৮ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, যাদের বড় অংশই সীমিত আয়ের কারণে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারেন না। তাই কৃষিকে আরও গবেষণাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি খাতে ভর্তুকি, সার, বীজ ও সেচ সুবিধা দেওয়া হলেও এখন প্রয়োজন দেশের মাটি, জলবায়ু ও উৎপাদন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া। কারণ কৃষি এমন একটি খাত, যা শিল্পের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হয় না; বরং প্রাকৃতিক ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
মন্ত্রী বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে তিনটি বিষয়ে একযোগে কাজ করতে হবে—লজিস্টিক ব্যয় কমানো, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। উৎপাদনশীলতা বাড়লে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি ভোক্তার জন্যও খাদ্যপণ্য তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার মণ্ডল, সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুল মাজিদ এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা।













