বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উপস্থিতি সংখ্যায় সীমিত হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের প্রভাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণে স্পষ্টতই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ঋণ ও বাজার অংশীদারিত্ব কমলেও শক্তিশালী মূলধন, উচ্চ তারল্য এবং তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণের কারণে তাদের আর্থিক ভিত্তি এখনো দৃঢ় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ ও বিশেষ সমীক্ষা ও প্রকল্প বিভাগ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এসব ব্যাংক মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। তবে একই সময়ে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতে তাদের আমানতের অংশ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। আমানতের বড় অংশই চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব এবং আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা (আরএফসিডি) হিসাবে থাকায় তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সুবিধা পাচ্ছে এসব ব্যাংক।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ঋণ বিতরণে। এক বছরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিম ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৬ হাজার ১২৩ কোটি টাকায় নেমেছে, যা প্রায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস। একই সময়ে মোট ব্যাংকিং খাতের ঋণে তাদের অংশও ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
তবে ঋণ কমালেও শিল্প খাত থেকে সরে যায়নি বিদেশি ব্যাংকগুলো। মোট ঋণের ৫২ শতাংশই শিল্প খাতে গেছে এবং এ খাতে অর্থায়ন এক বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিপরীতে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কমেছে। কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতেও ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি এখনো তাদের আর্থিক সক্ষমতা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ন্যূনতম সীমার অনেক ওপরে। একই সময়ে কমন ইকুইটি টিয়ার-১ ছিল ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ, লিভারেজ রেশিও ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তারল্য কাভারেজ অনুপাত ৪৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও ১৩২ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, তা এখনো অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম।
বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে ৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে, যা মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে রেমিট্যান্স আহরণে তাদের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে একই সময়ে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় কমেছে এবং বিদেশে পাঠানো মুনাফা ও লভ্যাংশ বেড়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বিদেশি ব্যাংকগুলোর উচ্চ মূলধন, পর্যাপ্ত তারল্য এবং কম খেলাপি ঋণ তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রমাণ। তবে ঋণ বিতরণ ও বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন আরও বাড়াতে পারলে এবং করপোরেট গ্রাহকের বাইরে নতুন খাতে অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান আরও শক্তিশালী হবে।













