চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল আলোচিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।
রোববার আয়োজিত নির্মাণকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুই এবং বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়েন বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে সিইআইজেডের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়, কয়েকটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। প্রায় ৭০ জন চীনা ব্যবসায়ী ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি হবে বিনিয়োগ। তাঁর মতে, চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের অগ্রগতি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত। তাঁর ভাষায়, এই প্রকল্প শুধু নির্মাণকাজের সূচনা নয়, বরং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের একটি নতুন ভিত্তি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চট্টগ্রামে সিইআইজেডের নির্মাণকাজ শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের ফল বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তিনি দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও গভীর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর ইতোমধ্যে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে ১৪ দিনের মধ্যেই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হবে।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে সিইআইজেড। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের লক্ষ্য বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরের চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এই প্রকল্পের ভিত্তি তৈরি হয়।
গত ১৭ জুন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি ও ভূমি ইজারা চুক্তির অনুমোদন দেয়। কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকবে বেজার এবং ৭০ শতাংশ শেয়ার থাকবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের হাতে।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বহুমুখী জেটি, চার লেন সড়ক, গ্যাস সংযোগ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, পানি সংরক্ষণাগার, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র এবং অন্যান্য শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেবে। বৈদেশিক ঋণের অর্থ চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট সুবিধা থেকে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেজা বলছে, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় সিইআইজেড ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের শিল্প অবকাঠামো গড়ে উঠলে এটি চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক শিল্প ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে প্রকল্পটির ঘোষিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবে কত দ্রুত অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে অবকাঠামো নির্মাণের গতি, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং শিল্পকারখানা স্থাপনের অগ্রগতির ওপর।













