রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সরকারঘোষিত ৪১ লাখ দরিদ্র পরিবারকে সঠিকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া সম্ভব হলে দেশের দারিদ্র্যের হার এক ধাক্কায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। তবে কাগজের কলমে অত্যন্ত সময়োপযোগী এই কর্মসূচির মূল চ্যালেঞ্জই হবে স্বজনপ্রীতি ও অপচয় রোধ করে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন ও স্বচ্ছ বিতরণপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাজেট ২০২৭: সংস্কারের সংকেত, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও বাস্তবায়নের ঝুঁকি’ শীর্ষক এক সেমিনারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানো হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে র্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া। এর মাধ্যমে দেশের ৪১ লাখ নারীপ্রধান দরিদ্র পরিবারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
র্যাপিডের প্রক্ষেপণ ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই ফ্যামিলি কার্ড যদি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা যায়, তাহলে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসবে। অর্থাৎ দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমবে।
এম এ রাজ্জাক তাঁর প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে যদি এই কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়িয়ে দেশের সব দরিদ্র পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনা সম্ভব হয়, তাহলে দারিদ্র্যের হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। অর্থাৎ দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এটি একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে।
উপাত্ত তুলে ধরে সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুসারে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে এর পরের বছরগুলোতে ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক সংকটের বিবেচনায় দারিদ্র্যের হার আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে।
কাগজে-কলমে এই ফ্যামিলি কার্ড অত্যন্ত সময়োপযোগী হলেও এর মূল বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জ হবে সঠিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন ও সম্পূর্ণ বিতরণপ্রক্রিয়া। কারণ অতীতে দেশের অনেক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের নজির রয়েছে বলে জানান এম এ রাজ্জাক।
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফের সঞ্চালনায় এই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী।
সেমিনারে বাজেটের নানা দিক ও খুঁটিনাটি নিয়ে প্যানেল আলোচনা করেন তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমরা বলছি সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য উন্নয়ন এবং সবাইকে নিয়ে উন্নয়ন। বাংলাদেশ এখন লাখ কোটি বা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাজেটে সেই কৌশল ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।’
দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যূনতম পাঁচটি বিশেষ বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করছে বলে জানান উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এই পাঁচ প্রতিশ্রুত বিষয় হচ্ছে—প্রথমত, নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, যার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বাজেটে আগামী পাঁচ বছরের করকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমিয়ে আনা। তৃতীয়ত, শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সঠিক সমন্বয় করা এবং পঞ্চমত, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিক উন্নয়ন সাধন করা।
তবে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বাজেট ঘাটতি মেটাতে করব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে সব খাতকে সমান সুবিধা দেওয়ার জোর দাবি জানান।
নীতিনির্ধারকদের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা বারবার বলা হলেও বাস্তব নীতিনির্ধারণে স্পষ্ট বৈষম্য ও দ্বিমুখী নীতি রয়েছে। সরকার আটটি বিশেষ খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দিলেও, সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত রেখেছে, যা বর্তমান ব্যবসায়িক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অবাস্তব।













