দেশের মোট শিল্প খাতের ৯০ শতাংশ এবং জিডিপির এক-চতুর্থাংশ দখল করে থাকলেও শুধু বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ও অবকাঠামোগত সহায়তার অভাবে রপ্তানি বাজারে চরমভাবে পিছিয়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) শিল্প খাত। শনিবার সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে আয়োজিত এক জাতীয় সম্মেলনে উন্মোচিত বিল্ড-এর গবেষণা প্রতিবেদনে এই প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার নির্মম চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপকৃত ১০৭টি এসএমই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিও কখনো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা পায়নি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতি সম্পর্কে সচেতনতা মাত্র ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিএফএটি -এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মোঃ শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিল্ড-এর গবেষণা পরিচালক ড. ওয়াসেল বিন শাদাত। এছাড়া বক্তব্য দেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বিল্ড-এর চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ উল্লাহ।
গবেষণায় দেখা গেছে, আরএমজি-বহির্ভূত সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিশ্ববাজারে প্রবেশের প্রধান বাধা কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ক এবং কাঠামোগত জটিলতা। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে থাকা হোম টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সুতার ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্কের কারণে বিশ্ববাজারে পুরোপুরি অপ্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়ছে। তবে আশার কথা হলো, ডিউটি-ফ্রি বা শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং নিয়মকানুন সহজ করা হলে দেশের প্রায় ৪৮.৪ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানিতে অংশ নিতে আগ্রহী।
সম্মেলনে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানান, এসএমই খাতের এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট দূর করতে এডিবির সহায়তায় একটি বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যা লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করবে। এছাড়া পূর্বাচলে ১৫০ একর জমিতে একটি বিশাল ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপনের মেগা পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একটি নির্দিষ্ট কমিশনের মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং অলিগার্কিক বা গুটিকয়েক বড় গোষ্ঠীর সুবিধার পরিবর্তে সব ধরনের এন্টারপ্রাইজকে সহায়তা করতে একটি স্ট্যান্ডার্ড চেকলিস্ট তৈরি করা হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান তৈরি পোশাক খাতের বাইরে থাকা ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর প্রতি বৈষম্যের প্রশ্ন তুলে বলেন, “তৈরি পোশাক খাতে এসএমই খাতের একটি উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে এবং সেখানে বন্ডেড ওয়্যারহাউসসহ বিভিন্ন বিশেষ সরকারি ও নীতিগত সহায়তা পাওয়ার কারণে তাদের সাফল্য আজ একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। কিন্তু আমার মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন একই ধরনের বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় ও উদীয়মান এসএমই খাতে দেওয়া হচ্ছে না?”
ড. মোস্তাফিজুর রহমান অবিলম্বে হোম টেক্সটাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় অ-পোশাক খাতে সমান সুযোগ-সুবিধা ও বন্ডের সুবিধা প্রদানের জোরালো আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সফল উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যারা শতভাগ পণ্য রপ্তানি করতে পারে না, সেই আংশিক রপ্তানিকারকদের জন্যও বিশেষ সরকারি আর্থিক ও আইনি সহায়তা ব্যবস্থার নীতিগত সুপারিশ করেন তিনি। এছাড়া বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষুদ্র শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, উন্নত অবকাঠামো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।
সম্মেলনে বিল্ড-এর চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান এসএমই খাতের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “এসএমই খাত আমাদের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা প্রায় ৮০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। কিন্তু বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তার অভাবে রপ্তানিতে এই খাতের অবদান খুবই সীমিত থেকে গেছে।” তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু অত্যন্ত দ্রুত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাই বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি দেশের জন্য একটি অপরিহার্য জাতীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে ড. ওয়াসেল বিন শাদাত জানান, জরিপ করা ১০৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেউ কখনো বন্ডেড সুবিধা পায়নি এবং কাঠামোগত জটিলতা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ক দেশের ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে হোম টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সুতার ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্কের কারণে বিশ্ববাজারে পুরোপুরি অপ্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়ছে। তবে আশার কথা হলো, ডিউটি-ফ্রি বা শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং সহজ নিয়ম পেলে দেশের প্রায় ৪৮.৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানিতে অংশ নিতে আগ্রহী। এই লক্ষ্যে আংশিক রপ্তানিকারক লাইসেন্স, কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার স্থাপন এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক সূচক নির্ধারণের ৩টি স্তরের সংস্কার প্রস্তাব করেন তিনি।
সম্মেলনে এনবিআর-এর প্রথম সচিব মোহাম্মদ নাজিউর রহমান মিয়া জানান, নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসআরও-৩৮৪ সংশোধন করে ৩০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশনের শর্তটি সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হয়েছে এবং আরও নতুন ৯টি খাতকে বন্ডেড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা জানান, এসএমই খাতের জন্য ৯ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ ফান্ড বা তহবিল গঠন করা হয়েছে।
বিসিকের জেনারেল ম্যানেজার সরোয়ার হোসেন জানান, বিসিকের কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টারের মাধ্যমে অনেক শিল্প ইউনিটের বন্ডেড সুবিধার বাইরে থাকার সংকট সমাধান সম্ভব। বিল্ড-এর সিইও ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, সম্ভাব্য রপ্তানিকারকদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশও যদি সফল হয়, তবে তা দেশের রপ্তানি খাতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাবে।













