বিশ্বব্যাপী পাচার হওয়া বা চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের সাফল্যের হার ২ শতাংশের কম এবং এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগে—এমন এক নির্মম ও কঠিন সত্য প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তবে এই বৈশ্বিক বাস্তবতার পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে ব্যাংক ডাকাত ও চোরদের বিদেশের মাটিতেও শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর জানান, ইতিমধ্যে ১০টি আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক এজেন্সির সহায়তায় বেশ কয়েকটি দেশে এস আলম গ্রুপসহ অন্যান্য শীর্ষ লুটেরাদের সম্পদ সম্পূর্ণ ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আরও জানান, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশ অর্থই বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে চুরি ও লোপাট হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের পাহাড় মাথায় নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করলেও ধসে পড়া এই খাতকে স্টেবিলাইজ ও রিক্যাপিটালাইজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ছড়ানো গুজব নাকচ করে গভর্নর কয়েকটি সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন এবং মনোনীত এমডি অপারগতা জানান। পরবর্তীতে মে মাসের শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনে নতুন বোর্ড গঠিত হয় এবং গত সপ্তাহে ব্যাংকটির প্রথম সফল পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গভর্নর স্বীকার করেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার বা ডেটা ইন্টিগ্রেশনের কোনো কাজই আগে করা হয়নি, যা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বড় আইকন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচজনের বোর্ডে অনিয়মের অভিযোগে গত ১৬ মার্চ একজনকে বদলানো ছাড়া কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করা হয়নি। তবে ঈদের আগে অপ্রত্যাশিতভাবে চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পর দ্রুত নতুন নিয়োগ দিয়ে আমানতকারীদের টাকা তোলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের এডি রেশিও (ঋণ-আমানত অনুপাত) ছিল ৯৩ শতাংশ, যা মার্চে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে, অথচ সর্বোচ্চ সীমা ৯২ শতাংশ। এস আলম গ্রুপ একাই এই ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি লুটে নিয়েছে। এছাড়া আগামী সপ্তাহ থেকে বিগত ১২ বছর ধরে আটকে থাকা কয়েকটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিকুইডিটি বা নগদ টাকার কোনো সংকট নেই দাবি করে গভর্নর একটি বড় ধরনের নীতিগত ঘোষণা দেন। আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে বাংলাদেশে ‘বাংলা কিউআর’ কোড সবার জন্য ম্যান্ডেটরি বা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ফুটপাতের দোকানদার থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের ডিজিটাল ট্রানজেকশন একক কিউআরের আওতায় এনে আগামীতে নগদ টাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ কমিয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি গঠন করা হবে।













