একদিকে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ৫৬ হাজার কোটি টাকার অপরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের পাহাড় ও একপেশে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর ফাঁদ, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার মুখে আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল কিনে জ্বালানি খাতকে সচল রাখার রুদ্ধশ্বাস লড়াই। শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিগত ১৭ বছরের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নজিরবিহীন লুটপাট, অনিয়ম এবং বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে এভাবেই বিস্ফোরক ও বিশদ তথ্য তুলে ধরলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী জানান, তারা ক্ষমতায় এসে মূলত বিগত আমলের ‘লুটপাটের ব্যাগেজ’ বা আবর্জনার বোঝা বহন করছেন। তবে এই তীব্র সংকটের মাঝেও নতুন বাজেটে সৌরবিদ্যুতের ব্যাটারিসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে শুল্ক শূন্য করে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার উৎপাদনের মেগা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগের গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয় দেখেছি। আমাদের ল্যান্ডে ও সমুদ্রে গ্যাস পাওয়া যাবে, কিন্তু এই ১৭ বছরে সেখানে এক্সপ্লোর বা অনুসন্ধানের কোনো উপকরণ তৈরি করা হয়নি। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের একটি দুর্দান্ত সাকসেস স্টোরি থাকার পরও বিগত সরকার সংস্থাটিকে একপ্রকার অবশ ও নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল।”
জ্বালানি খাতের এই আমদানিনির্ভরতা কাটাতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই বাপেক্সকে সম্পূর্ণ সক্রিয় বা রি-অ্যাকটিভেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই লক্ষ্যে দেশের ভূখণ্ডে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে জরুরি ভিত্তিতে আরও ৫টি অত্যাধুনিক লিক বা রিগ আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সমুদ্র ব্লকের গ্যাস উত্তোলনের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, প্রতিবেশী দেশগুলো ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে তা ব্যবহার ও রপ্তানি করছে। কিন্তু গভীর সমুদ্রে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাপেক্সের না থাকায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) ইনভাইট বা দরপত্রের আহ্বান জানানো হয়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে উন্মুক্ত এই টেন্ডার কল করা হয়েছে এবং আগামী এক মাস পর টেন্ডার ক্লোজিং হলে আইওসিদের সাথে আলোচনা করে দ্রুত ব্লকগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বিশ্বের বর্তমান যুদ্ধাবস্থা ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার অস্থিরতা কীভাবে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলেছে, তার একটি বাস্তবিক চিত্র তুলে ধরেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, ওমান বা হরমুজ প্রণালিতে ঝামেলা হওয়ার পর জি-টু-জি চুক্তিতে থাকা কাতার এবং সৌদি আরব—উভয় রাষ্ট্রই বাংলাদেশের কাছে ‘ফোর্স মেজর’ (অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত চুক্তি স্থগিতের আইনি দাবি) ক্লেইম করেছে।
ফোর্স মেজর ক্লেইম করার পর সরকারের হাত বাঁধা থাকায় বাধ্য হয়ে অন্য বিকল্প সোর্স থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল ও গ্যাস ক্রয় করতে হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর তথ্য উল্লেখ করে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, দেশের জ্বালানি সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে অলরেডি প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল ক্রয় করে সাপ্লাই চেইন সচল রেখেছে।
মন্ত্রী দাবি করেন, “এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকার ফ্লোরিডার মতো ডেভলপড বা উন্নত জায়গায় তেলের পাম্প ড্রাই বা শূন্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে একদিনের জন্যও তেল ড্রাই হয়নি। বাংলাদেশের তেলের সাপ্লাই সবসময় স্টেবল ছিল, এখনো আছে।” তবে সমস্যা তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে, যেখানে বিগত সরকারের করা হিসাববিহীন আইপিপি (স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র) থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনে কনজিউমার বা গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে এবং এই বিশাল গ্যাপ বা লোকসানের ভর্তুকি অর্থ মন্ত্রণালয়কে টানতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত বা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নিয়ে মন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি বলেন, “বিগত সরকার স্রেফ চুরি করার জন্য ইনভেস্টরদের পক্ষে এবং সরকারের বিপক্ষে একপেশে এগ্রিমেন্ট বা চুক্তি করেছিল। এগুলোকে ব্যাংকেবল করার জন্য রাষ্ট্রীয় সভরেন গ্যারান্টি দিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের নিয়ম চালানো হয়েছে। আমি ডে-ওয়ানেই এটা নিয়ে বসেছিলাম এবং চীনা ইনভেস্টরদের সাথেও নেগোসিয়েশন করার চেষ্টা করেছি।”
চীনা বিনিয়োগকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করলে তাদের আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো টাকা চাইবে এবং তারা পাওয়ার স্টেশন বা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারবে না। মন্ত্রী অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, সরকার জোর করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করতে গেলে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেবে, যার ফলে দেশে নতুন করে পাওয়ার ক্রাইসিস বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
বিগত আমলে নিজেদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মেরামত বা মেইনটেন্যান্স না করে বসিয়ে রেখে প্রাইভেট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ কেনার কারণেই আজ আইপিপিগুলোর ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। এই আইনি ও আর্থিক জট থেকে বের হতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট ওপিনিয়ন বা মতামতের জন্য পাঠিয়েছে। ল মিনিস্ট্রির কাছ থেকে ফেভারেবল বা ইতিবাচক অপিনিয়ন আসলেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ চিরতরে অ্যাড্রেস করা হবে।
বিগত সরকারের আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের দুটি জ্যান্ত উদাহরণ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। প্রথমটি হলো, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৫ লাখ ডিজিটাল মিটারের অর্ডার। বিগত আমলে আড়াই লাখ মিটার এনে ৩ বছরে মাত্র ৬৫টি মিটার সিনক্রোনাইজ করা সম্ভব হয়েছে, বাকি সব গোডাউনে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
বর্তমান সরকার এসে বাকি আড়াই লক্ষ মিটারের অর্ডার ডিসকন্টিনিউ বা বাতিল করতে গিয়ে দেখে, জাহাজীকরণের অর্ডার অলরেডি হয়ে গেছে। এখন বাতিল করলে বিদেশি কোম্পানি আন্তর্জাতিক কোর্টে গিয়ে জিতে যাবে, কারণ পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড নিজেই তাদের জবাবদিহিতার ফাঁক রেখে কাজ দিয়েছিল। মন্ত্রী স্পষ্ট বলেন, “এই চতুর পদ্ধতিতে সরকারি বোর্ডগুলোকে ব্যবহার করে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে চলে যাওয়া হয়েছে।”
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে ডিপিডিসির নভেম্বর মাসে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া আন্ডারগ্রাউন্ড সাবস্টেশন প্রকল্পের কথা বলেন। ৬৫টি সাবস্টেশনের মধ্যে মাত্র ৩৮টি বসেছে, অথচ এই লসমেকিং বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানটি শাহবাগের পিছনে বিলাসবহুল ‘টুইন টাওয়ার’ বিল্ডিং বানিয়েছে। যেখানে আন্তর্জাতিক মানের সুইমিংপুল এবং জিম তৈরি করা হয়েছে জনগণের টাকায়। এখন প্রকল্পগুলোর কাজ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ হওয়ায় এগুলো বন্ধও করা যাচ্ছে না, আবার চালানোও কঠিন ব্যাগেজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পোশাক রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের বাধ্যবাধকতার কারণে দেশে সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার পাওয়ারের গুরুত্ব অপরিসীম বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “অনেকে বলছেন সোলারের প্রয়োজন নাই। কিন্তু আমি বলছি সোলারের তীব্র প্রয়োজন আছে। ইউরোপিয়ান কান্ট্রিগুলো আমাদের গার্মেন্টস এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে, অন্তত ৩০ শতাংশ সোলার বা রিনিউয়েবল এনার্জি ইউজ না করলে তারা ডিউটি বা শুল্ক বাড়িয়ে দেবে কিংবা এক্সপোর্ট কমিয়ে দেবে।”
রপ্তানি টিকিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশকে ব্যাটারি বেসড সোলারে যেতেই হবে, যাতে দিনের আলো না থাকলেও ব্যাংক বা ব্যাটারিতে থাকা ব্যাকআপ দিয়ে রাতেও পাওয়ার সাপ্লাই দেওয়া যায়। এই কারণেই দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সোলারের ব্যাটারিসহ সব উপকরণের ওপর ডিউটি বা আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ জিরো বা শূন্য করে দিয়েছে সরকার।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মন্ত্রী নিজেই জনগণের কাছে একটু সময় চেয়ে বলেছেন, “আমরা তো মাত্র কয়েক মাস হলো গভর্মেন্ট বা দায়িত্ব নিয়েছি। তবে আমরা পজিটিভলি কাজ শুরু করেছি, আশা করি আগামী দুই থেকে আড়াই বছর পর থেকে দেশবাসী আমাদের এই খাটুনির বাস্তব ফল পেতে শুরু করবেন।”













