জনগণের করের টাকায় ব্যাংক লুটেরাদের পাপমোচন

Web Photo Card June 11 2026 BankingSectorReformBD
ছবি: পিআইডি

একদিকে সাধারণ নাগরিকের নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার শুরুতেই টিআইএন বাধ্যতামূলক করে করের জাল বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ, অন্যদিকে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপসহ শীর্ষ ব্যাংক ডাকাতদের লুটে নেওয়া অর্থ ভরাট করতে জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকার দেদার ব্যবহার। ব্যাংক লুটেরাদের তৈরি করা ক্ষতের মুখে প্রলেপ দিতে নতুন বাজেটে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেইলআউট বা পুনর্গঠন বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পর্যালোচনায় দেশের আর্থিক খাতের এক চরম বৈষম্যমূলক ও নির্মম বাস্তবতার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে চলা নজিরবিহীন লুটপাটের কারণে ধসে পড়া ব্যাংকিং খাতকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে এবারও জনগণের পকেট কাটার অর্থ দিয়ে ‘ব্যাংক পুনর্গঠন ও একীভূতকরণ’ নামের আইনি মোড়কে হাজার হাজার কোটি টাকার অবিশ্বাস্য ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। বাজেট প্রস্তাবনায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগান ও একীভূতকরণ কার্যক্রম সচল রাখতে নতুন বাজেটে সম্পূর্ণ এককভাবে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাজেট নথিতে এই বিশাল অর্থকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘শেয়ার ও ইকুইটি’ বাবদ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হলেও, অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা একে ব্যাংক লুটেরাদের তৈরি করা বিশাল গর্ত জনগণের টাকায় ভরাট করার এক প্রাতিষ্ঠানিক অপচেষ্টা বলে অভিহিত করছেন। শুধু আগামী বছরই নয়, অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন যে, ব্যাংকগুলোর এই কৃত্রিম সক্ষমতা ফেরাতে ও পুনঃ মূলধনীকরণের লক্ষ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটেও সরকারকে ৪১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

এর মানে হলো, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ব্যাংক লুটেরাদের পাপমোচন করতে সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত আয়ের প্রায় ৭৮ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা স্রেফ বাতাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রামের বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ একাই বেসরকারি খাতের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বেনামি ঋণ ও ভুয়া এলসির মাধ্যমে লাখো কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে।

ফলশ্রুতিতে, এই পাঁচটি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পেরে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের রূপান্তরকালীন সময়ে এই তীব্র সংকট সামাল দিতে উক্ত পাঁচটি ধসে পড়া ব্যাংককে একীভূত করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত শরীয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।

এই নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও, এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি সরকারের কোষাগার তথা জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে জোগান দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকেও ঋণের নামে ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি একাই লুটে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। রাষ্ট্রায়ত্ত আরও কয়েকটি ব্যাংক থেকেও হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে।

এছাড়া আরও পাঁচটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে অবসায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় এবং আরও কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায়, এই পুঞ্জীভূত অন্যায়ের খেসারত দিতেই বাজেটে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার নতুন বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়েছে অর্থ বিভাগ।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় এই সংকটের দায় সম্পূর্ণভাবে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, “অতীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অনিয়ম ও সুশাসনের অভাবের কারণে ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগপ্রবাহ সচল রাখতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।” তিনি দাবি করেন, ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনায় রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাব বন্ধ করতে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হচ্ছে এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিব্যবস্থা চালু করা হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের এই লুটপাটের টাকা লুটেরাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আদায় করার পরিবর্তে যদি প্রতি বছর বাজেটের বিপুল অংশ দিয়ে ব্যাংক উদ্ধার করা হতে থাকে, তবে তা সৎ করদাতাদের সাথে এক ধরনের প্রতারণার শামিল। যেখানে মাধ্যমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে অর্থমন্ত্রীকে হিমশিম খেতে হয়েছে, সেখানে ব্যাংক ডাকাতদের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণে এক বছরেই ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার এক বড় ধরনের নৈতিক ও কাঠামোগত পরাজয়কে নির্দেশ করে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top