ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, মধ্যপ্রাচ্যের চরম যুদ্ধাবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ও রূপান্তরমূলক জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ১১ জুন জাতীয় সংসদে ‘স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্যতা’—এই পাঁচ স্তম্ভকে কেন্দ্রে রেখে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই বাজেট পেশ করা হয়।
নতুন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে প্রণীত এই বাজেট একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন বরাদ্দের সুখবর এনেছে, অন্য দিকে তেমনি বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও ঋণের চাবুকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অন্তর্বর্তী সরকারের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১৯.০৪ শতাংশ (১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা)। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করেছেন যে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এই সামষ্টিক কৌশল সাজানো হয়েছে। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করার এক দ্বিমুখী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। ফলে সার্বিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ 8৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা হয়েছে। শতাংশের দিক থেকে ঘাটতি গত বছরের সমান হলেও, টাকার অঙ্কে তা বিশাল।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, চলতি বছরে যেখানে প্রকৃত রাজস্ব আদায় ৫ লাখ কোটি টাকার নিচে থাকার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে এক লাফে পৌনে ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রায় অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রার পরও প্রস্তাবিত বাজেটে বিশাল ঘাটতি থেকে যাবে, যা মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের ওপর চরমভাবে নির্ভর করতে হবে। ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে, যার মধ্যে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান বাদ দিলে নিট বিদেশি ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের চেয়ে যা প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় ব্যাংকঋণের লক্ষ্য ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোকে ইতিবাচক মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিগত সরকারের আমলের লাগামহীন ঋণ গ্রহণকে বর্তমানের এই বিশাল ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, অতীতের অপচয় ও লুটপাটের কারণে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ, বাজেটের এক বিশাল অংশ (১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) কেবল সুদ পরিশোধেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
সিপিডির তথ্য এবং অর্থমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান মেলালে দেশের ঋণের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপির তৎকালীন মেয়াদের শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গত ২১ বছরে দেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ লাখ ৬৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। এই ঋণের ফাঁদ থেকে বের হতে সরকার ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বাজেটের নীতিগত দিকনির্দেশনা ও অগ্রাধিকার সঠিক হলেও এর মূল চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আহরণ এবং বাস্তবায়ন। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে করের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি বাড়াতে হবে এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তবে ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাই রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে এবং ব্যাংক পুনর্গঠন কার্যক্রমে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবার পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামানো হয়েছে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। খাতওয়ারি বরাদ্দে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য এবার সর্বোচ্চ ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ পেয়েছে ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি অর্থাৎ ১.০২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মোট পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা (স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৪৯,৩৮৭ কোটি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষায় ১৩,৪৬৬ কোটি)। এছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য ৪০ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সড়ক পরিবহনে ৩৬ হাজার ৯১৮ কোটি, স্বস্থানে ৩১ হাজার ৯৯ কোটি, সমাজে ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি এবং কৃষি খাতে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এই বাজেট এক মিশ্র বার্তা বহন করছে। সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর এসেছে সরকারি চাকুরিজীবী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য। অর্থমন্ত্রী আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে ‘নবম বেতনকাঠামো’ বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। এই সংস্কারের আংশিক বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন বেতন ও ভাতার পেছনে ব্যয় হবে। এর ফলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত হওয়ার পথ সুগম হলো।
সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের আওতায় পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দিতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা ৭০০ টাকা (উপকারভোগী ৬২ লাখ), বিধবা ভাতা ৭০০ টাকা (৩০ লাখ), এবং প্রতিবন্ধী ভাতা ১,০০০ টাকা (৩৮ লাখ) করার প্রস্তাব এসেছে। ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব জ্যেষ্ঠ নাগরিকের জন্য ট্রেনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভ্রমণ এবং মেট্রোরেলের ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোর জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের জন্য ক্যাটাগরি ভেদে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রবাসীকল্যাণ সেবা, বিমা ও জরুরি সহায়তার সঙ্গে প্রবাসীদের যুক্ত করতে বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতে আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা বহাল থাকবে। রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়াসহ নতুন সাতটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খোলার প্রক্রিয়া জোরদার করার তথ্যও বাজেট বক্তৃতায় উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য খাতে হৃদরোগের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের লেন্সের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করায় স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং লেন্সের দাম ৫ হাজার টাকা কমবে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
মধ্যবিত্তের জন্য ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে সামান্য বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হলেও সর্বোচ্চ আয়কর স্তর ৩৫ শতাংশ করায় দক্ষ পেশাজীবীদের ওপর করের চাপ বাড়বে। অন্যদিকে, নতুন যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় করের জাল বাড়লেও শিক্ষার্থী, কৃষক, সামাজিক ভাতাভোগী ও পেনশনভোগীদের এই নিয়ম থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য দুটি একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন হবে। জ্বালানি সংকট, আমদানি প্রতিবন্ধকতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ব্যয়ের দক্ষ পুনর্বিন্যাস ছাড়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যাবে না।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাশরুর রিয়াজ মনে করেন, বাজেটে নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমানো ও চিকিৎসার ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগে মধ্যবিত্ত পরোক্ষ সুবিধা পাবে। তবে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির সুফল সীমিত, কারণ করহার শুরুই হচ্ছে ১০ শতাংশ থেকে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষার মেগা স্কিমগুলো পুরোপুরি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক হওয়ায় শহুরে মধ্যবিত্ত, বেসরকারি চাকুরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা কাঠামো রাখা হয়নি।
বাজেটটিকে সামগ্রিকভাবে শিল্প ও প্রযুক্তিবান্ধব হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে পিওএস মেশিন আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, সব ধরনের স্মার্টকার্ড, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড তৈরির ১০টি কাঁচামালে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি সম্পূর্ণ মওকুফ এবং এপিআই তৈরির ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাবে। সবুজ যাতায়াত উৎসাহিত করতে তেলের গাড়িতে শুল্ক বাড়িয়ে ১৫৫ শতাংশ করা হলেও, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) শুল্ক ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে। ইভি চার্জার আমদানিতে শুল্ক শূন্য করা এবং স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক বাস-ট্রাক ও ই-বাইক উৎপাদনে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ও শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় নীতিগত স্বস্তি এসেছে উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করার আইনি সংস্কারে, যা ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধনের সংকট দূর করবে। এছাড়া অর্থবিলে বিনা প্রশ্নে ফ্ল্যাট-প্লটে অপ্রদর্শিত আয় বা কালোটাকা নিয়মিত কর হারে প্রদর্শন করে সাদা করার সুযোগ আবাসন খাতে স্বপ্রবৃত্ত বিনিয়োগ বাড়াবে। তবে রডের সুনির্দিষ্ট ভ্যাট টনপ্রতি ১,৫০০ টাকা করা এবং সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকারে শুল্ক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা করায় ফ্ল্যাটের নির্মাণ ব্যয় বাড়তে পারে। সরকার শূন্যপদে ৫ লাখ নতুন সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তরগুলোতে ২,৮৭৯ জনের নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফিকি, বিটিএমএ এবং ঢাকা চেম্বার পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৃহৎ করদাতাদের জন্য ই-ভ্যাট সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা ব্যবহারিক জটিলতা তৈরি করতে পারে, তবে অগ্রিম করের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ থাকলে তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। সরকারের নীতিগত সংস্কারকে সাধুবাদ জানালেও মাঠপর্যায়ে বাজেটের সফল বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছে। এছাড়া কর ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপে ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি এলেও প্রস্তাবিত বাজেটের উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির অনিশ্চয়তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
সামগ্রিক মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেটটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুরোপুরি সংস্কার ও স্বয়ংক্রিয় করার একটি সৎ ও সাহসী প্রচেষ্টা। স্বাস্থ্য খাতের বিশাল বরাদ্দ, ক্যাশলেস ট্রানজেকশনের নীতিগত সুবিধা, অগ্রিম করের আইনি স্বীকৃতি এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এর প্রকৃত সফলতা অর্থমন্ত্রীর সুশাসনের প্রতিশ্রুতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারকরণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং বহুল আলোচিত ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতার ওপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে।













