করদাতাদের প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি বন্ধ, কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা দমন এবং রাজস্ব আদায়ে শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে দেশের প্রাচীন কর কাঠামোতে বড় অস্ত্রোপচারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘রাজস্ব নীতি’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ বিভাগ দুটিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পৃথক করার ঐতিহাসিক সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নীতিনির্ধারণী দর্শনে সাজানো এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের এনবিআর সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে।
আইনি সংস্কার অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাজ হবে এখন থেকে কেবল নির্ধারিত কর ও শুল্ক মাঠপর্যায় থেকে আদায় করা। তারা নিজে থেকে কোনো নতুন করের নীতি বা আইন তৈরি করতে পারবে না; এই পুরো কাজটি সম্পন্ন করবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত টেকনিক্যাল উইং। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, একই বিভাগ করের নীতি তৈরি করবে এবং তারাই আবার মাঠপর্যায়ে কর আদায় করবে—এই প্রাচীন ব্যবস্থার কারণে তীব্র স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতো এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকত।
তবে রাজস্ব খাতের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের এই সাহসী উদ্যোগ বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও করনীতি ও প্রশাসনকে আলাদা করার নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কতিপয় প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও কর্মচারী ইউনিয়নের তীব্র অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ কর্মবিরতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত সেই বৈপ্লবিক সংস্কারটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। বিগত সরকারের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখেই এবার নতুন গণতান্ত্রিক সরকার শক্ত রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে আইনি সংস্কারে হাত দিয়েছে।
এই প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও হয়রানিমুক্ত করতে আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘ই-ভ্যাট’ সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করা পুরোপুরি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি আয়কর রিটার্নের সফল ডিজিটাল রূপান্তরের আদলে তৈরি এই নতুন ব্যবস্থার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর এনবিআর কর্মকর্তাদের দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে নথিপত্র সই করানোর জন্য মাসের পর মাস পোহাতে হবে না। ঘরে বসেই এক ক্লিকে ভ্যাট ফাইলিংয়ের এই বাধ্যবাধকতা ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অনেক কমিয়ে আনবে।
ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো সরকারের এই যুগান্তকারী কাঠামোগত পরিবর্তন ও কর প্রশাসনের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবির প্রতিফলন হিসেবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। দেশের ব্যবসায়ী মহল ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা, নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্বাধীন উইংয়ের কাছে চলে গেলে মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তারা আর নিজেদের খেয়ালখুশিমতো সাধারণ করদাতাদের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপাতে বা হেনস্তা করতে পারবেন না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ যেমন অনেক বেশি সুরক্ষিত হবে, তেমনি রাজস্ব বোর্ড ও করদাতাদের মধ্যে চলমান পারস্পরিক আস্থার সংকটটি চিরতরে কেটে যাবে।













