প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের আগেই একনেকে উঠছে চীনা ইকোনমিক জোন

Web Photo Card June 8 2026 CEIZ
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বেইজিং সফরের ঠিক আগে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম বৃহৎ রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) ভিত্তিতে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উঠছে। দীর্ঘ এক দশকের আমলাতান্ত্রিক ও অর্থায়ন জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার এই পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত অনুমোদনের টেবিলে স্থান পেল।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একনেকে এই প্রকল্পের অনুমোদন কেবল অবকাঠামোগত অগ্রগতি নয়, বরং চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে বেইজিংয়ের প্রতি ঢাকার একটি শক্তিশালী ইতিবাচক ভূ-অর্থনৈতিক বার্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের খরা কাটানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) সংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব জোরদার করার ক্ষেত্রে এটিকে সরকারের একটি বড় কৌশলগত চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকারি উচ্চপর্যায়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৩ জুন চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন। এই সফরের মাঠ প্রস্তুত করতে এবং এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম ইতোমধ্যে বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুয়া চুনইংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। বেইজিংয়ের সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং নতুন বিনিয়োগ সহযোগিতার পাশাপাশি আনোয়ারার এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয়েছে।

কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। নবনির্মিত কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একদম কাছাকাছি হওয়ায় এই অঞ্চলের লজিস্টিকস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য আদর্শ। সরকার দীর্ঘমেয়াদে এই জোনটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা বিনিয়োগ ও ভারী শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান হাব বা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই প্রকল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে এই অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও আন্তর্জাতিক ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়নের জটিল সমীকরণ এবং দুই দেশের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটি টানা ১০ বছর ফাইলবন্দি হয়ে থাকে।

শুরুতে এই প্রকল্পের মূল ডেভেলপার হিসেবে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’ (সিএইচইসি)-কে বিবেচনা করা হলেও দীর্ঘ আলোচনার পরও তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে বেইজিংয়ের নতুন মনোনয়নের ভিত্তিতে ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ (সিআরবিসি) এই প্রকল্পের নতুন ডেভেলপার হিসেবে দায়িত্ব পায়। বর্তমানে বেজা এবং সিআরবিসির মধ্যে চূড়ান্ত ‘ডিপ্লোম্যাট/ডেভেলপার অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

একনেকে উপস্থাপিত সর্বশেষ পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মোট ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের ‘প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট’ (পিবিসি) ঋণের আওতায় পাওয়া যাবে।

এই প্রকল্পের অধীনে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন পরিবেশ তৈরিতে বেশ কিছু বড় অবকাঠামো নির্মিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতার একটি বহুমুখী জেটি, ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক রোড ও ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশাল কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)। এছাড়াও নিরবচ্ছিন্ন উপযোগ সেবা নিশ্চিত করতে গ্যাস সরবরাহ লাইনের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, উচ্চ ক্ষমতার ট্রান্সমিশন লাইন, পানি সংরক্ষণাগার এবং ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।

অবশ্য এই মেগা প্রকল্পটির কিছু খাতের ব্যয় প্রাক্কলন নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ ও আপত্তিও রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন অঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কমিশনের কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেছেন, সর্বশেষ ডিপিপিতে অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ এবং পানি সংরক্ষণাগার খাতের ব্যয় স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও জবাব চাওয়া হয়েছে বেজার কাছে।

পাশাপাশি, যে চীনা প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে, তাকেই আবার মূল ডেভেলপার হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিয়েও পরিকল্পনা কমিশনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে। তবে বেজা আইনি ব্যাখ্যায় জানিয়েছে যে, এটি সম্পূর্ণ জিটুজি ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতেই সম্পন্ন করা হয়েছে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, চীনা পক্ষের সঙ্গে ঋণ চুক্তি ও বাস্তবায়ন রূপরেখা নিয়ে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং প্রকল্পটিকে উভয় দেশই তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। জমি অধিগ্রহণ যেহেতু শতভাগ শেষ, তাই একনেকের সবুজ সংকেত ও প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরপরই সরাসরি মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার দিক থেকে এই প্রকল্প সফল হলে দেশের উৎপাদন খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করছে সরকার। বেজার প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই ইকোনমিক জোন পুরোপুরি চালু হলে টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ভারী লোহা ও অটোমোবাইল এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে সরাসরি অন্তত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা) সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে। একই সাথে এই অঞ্চলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের উচ্চমানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা কূটনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ধোঁয়াশা কাটিয়ে অবশেষে আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি দৃশ্যমান বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের ঠিক আগমুহূর্তে একনেকের এই অনুমোদন কেবল একটি প্রকল্পের সূচনা নয়, বরং ডলার সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের এক নতুন ও শক্তিশালী টেস্ট কেস হতে যাচ্ছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top