পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক উত্থানের সুযোগ নিয়ে পচা বা জাঙ্ক শেয়ার, স্বল্প মূলধনী শেয়ার এবং বছরের পর বছর বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি রুখতে কঠোর নজরদারির ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। বাজারে তথ্যের নামে ছড়ানো গুজবভিত্তিক কারসাজি বন্ধ করতে বিএসইসি, ডিএসই এবং সিডিবিএল-এর সমন্বয়ে সুনির্দিষ্ট ‘ট্রিগার’ বা অ্যালার্ট সম্বলিত একটি আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। নতুন এই ব্যবস্থায় যেকোনো শেয়ারের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা পাওয়ামাত্রই রিয়েল-টাইম সংকেতের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিত করার কঠোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় ‘সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশ’-এর ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ার নিয়ে তাঁর এই অ্যাকশন প্ল্যান ও কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
বিএসইসি চেয়ারম্যান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারীদের অন্ধ আবেগের ওপর ভর করে চলছে। বাজার একটু ওপরের দিকে গেলেই সিংহভাগ ট্রেডিং বা লেনদেন শুরু হয় জঙ্ক শেয়ারে, যা ফিন্যান্সের ভাষায় ‘এফিশিয়েন্ট মার্কেট হাইপোথিসিস’-এর দুর্বলতম রূপকে ফুটিয়ে তোলে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের পরিবর্তে ‘আগামীকাল অমুক শেয়ারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে’—এমন গুজব আর ইনসাইডার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের মরণফাঁদ তৈরি হয়।
বক্তব্যে নিজের জীবনের একটি বাস্তব উদাহরণ টেনে মাসুদ খান জানান, একবার এক অডিট ম্যানেজারের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি নিজেই ‘সিএনএ টেক্সটাইল’ নামের একটি বন্ধ কারখানার শেয়ার কিনেছিলেন। পরবর্তীতে এক ট্যাক্স কমিশনারের মাধ্যমে সরেজমিনে জানতে পারেন যে, ফ্যাক্টরি চালুর কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং সেটি পুরোপুরি লোহালক্কড়ের স্তূপ বা স্ক্র্যাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি পরদিনই তা বিক্রি করে বেঁচে যাই। এই গল্পটি বলার উদ্দেশ্যই হলো, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কারসাজিকারকেরা কীভাবে অচল কোম্পানিকে জ্যাকপট হিসেবে বাজারে বিক্রি করছে, তা স্পষ্ট করা।
মাসুদ খান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “শেয়ারবাজার বা কোম্পানির ভ্যালুয়েশন একটি বিজ্ঞান। একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের মতো ভ্যালুয়েশনের বিজ্ঞান না জেনে শেয়ার কেনা যায় না। কিন্তু আমাদের বাজারের অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীই এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অশিক্ষিত এবং অনভিজ্ঞ।” আর এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবই জাঙ্ক শেয়ার নিয়ে কারসাজির মূল সুযোগ তৈরি করে দেয়।
এই চক্র ভাঙতে বিএসইসির মূল অগ্রাধিকার হবে খুচরা-নির্ভর বাজারকে মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, ঠিক যেভাবে প্রতিযোগী দেশ ভারতে করা হয়। দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের করুণ ও হতাশাজনক দশা দূর করতে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পোর্টাল তৈরি করা হবে। সেখানে প্রতিটি ফান্ডের প্রকৃত পারফরম্যান্স ও গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই রিয়েল-টাইম প্রদর্শনের পাশাপাশি তাদের রেটিং বা র্যাংকিং করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য পথ খুঁজে পায় এবং জাঙ্ক শেয়ারের জুয়া থেকে দূরে থাকে।













